সাংবাদিক মিতালি এখন চায়েওয়ালি৷

931

 

২৩ বছরের সাংবাদিকতার জীবনও ছেড়ে দেওয়া যায়!

২৩ বছর ধরে সাংবাদিকতা করেছেন৷ এডুকেশন বিট থেকে পলিটিক্যাল বিট৷ একের পর এক দক্ষতার নজির গড়েছেন তিনি৷ তবে এখন তিনি চায়েওয়ালি৷সেই কথা শুনলেন দেবযানী সরকার

হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন৷ একদা সাংবাদিক মিতালি মিত্র এখন চা-দোকানী৷ পঞ্চাশোর্ধ এই মহিলার বর্ণময় জীবনের বাস্তব চিত্র দেখে এলেন দেবযানী সরকার৷

নদিয়ার কৃষ্ণনগরের মেয়ে মিতালি স্নাতকোত্তর হওয়ার পর পেশা হিসেবে বেছে নেন সাংবাদিকতাকে৷ ৯২-তে তাঁর প্রথম চাকরি ‘সংবাদ প্রতিদিনে’৷ এরপর ‘খাস খবর’, ‘আর প্লাস’ এবং ‘তারা নিউজ’-এ নির্ভীকতার সঙ্গে সাংবাদিকতা করেছেন তিনি৷

কিন্তু হঠাৎ একদিন ঠিক করলেন অনেক হয়েছে, এবার অন্য কিছু করতে হবে৷ খুব কম সময়ের মধ্যে নেওয়া সেই সিদ্ধান্তই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে৷ হিডকোর থেকে ওপেন টেন্ডারে জমি কিনে রাজারহাটের ইকো পার্কে চায়ের দোকান দিলেন মিতালি৷ শুরু হয় তাঁর নতুন জীবন সংগ্রাম৷ বোনঝি সুনেত্রা চৌধুরী ও দিপালী মন্ডল তাঁর সহযোদ্ধা৷ এই ত্রয়ীর হাতেই দোকানের স্টিয়ারিং৷Mitali-Mitra-pic

চায়ের দোকান বললেও এই দোকান অবশ্য পাড়ার আর পাঁচটা চায়ের দোকানের মতো নয়৷ ‘লিভস অ্যান অরোমা’ প্রকৃতির কোলে একটা ‘চা বুটিক’৷ যেখানে চায়ের কাপে তুফান তুলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা মারে প্রবীন থেকে জেন-ওয়াই৷ সেই আড্ডায় দেশীয় অর্থনীতি থেকে রাজনীতি, খেলাধুলো থেকে কূটনীতি৷ যেকোনও বিষয়ের উপর আলোচনাতেই তুমুল ঝড় ওঠে৷ চলে দেদার গানবাজনাও৷  মিতালির কথায়, ‘‘একরমই একটা পরিবেশ চেয়েছিলাম৷ দৈনন্দিন ব্যস্ততার মাঝেও যেখানে প্রাণ খুলে সবাই গল্প করতে পারবে৷ এই আড্ডাটাই আমাকে কাজের অক্সিজেন জোগায়৷’’

নিজেও আড্ডা দিতে ভালবাসেন মিতালি৷ সেই সঙ্গে অবশ্যই চা খেতে৷ সেই কারণেই কি এই ব্যবসায় আসা? প্রশ্নের উত্তরে মিতালি জানালেন, ঠিক তাই৷ তবে আগে বাড়িতে সাদামাটা চা বানাতেন তিনি৷ এখন অবশ্য তাঁর হাতের তৈরি অ্যারোমা টি অনেক মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছে৷ এরজন্য অবশ্য বিশেষ ট্রেনিংও নিয়েছেন তিনি৷ মসালা টি থেকে শুরু করে দার্জিলিং অর্থোডক্স টি, গ্রিন টি, অসম টি, কোল্ড টি যত রকম চা হতে পারে, সব ধরনের চা মিলবে এই দোকানে৷ এছাড়াও, ছোলা বাটোরা থেকে, আলুর পরোটা, দইবড়া৷বিভিন্ন রকমের বাড়ির তৈরি খাবার পাওয়া যাবে এখানে৷

Mitali-poc-2মিতালি মনে করেন, চায়ের স্বাদ তো আছেই, সেই সঙ্গে অ্যাম্বিয়েন্সই মানুষকে তাঁর দোকানমুখী করছে৷ ওয়াই-ফাই জোন ছাড়াও এই চা-বুটিকে রয়ছে ছোট্ট-খাটো লাইব্রেরি৷ বই পড়ার পাশাপাশি কেনাও যাবে৷

ব্যবসাই মিতালির মুখ্য উদ্দেশ্য নয়৷ নিজে কিছু একটা করার সঙ্গে সঙ্গে পিছিয়ে পরা মহিলাদেরও স্বাবলম্বী করতে চান তিনি৷ মাঝেমধ্যেই এখন তাঁর চা বুটিকে কয়েকজন হোমের মহিলারা এসে চা বানান৷ লিভস অ্যান অরোমাকে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি মিতালি স্বপ্ন দেখেন আরও অনেক অনেক মহিলাকে স্বাবলম্বী করার৷ নতুন উদ্যোগে মিতালি যে আত্মতৃপ্ত সেটা তাঁর শরীরি ভাষাই বলে দিচ্ছে৷

এক সময় ভোট আসলেই বাড়তি তাগিদ অনুভব করা মানুষটা আজ প্রকৃতির কোলে দোকান দিয়েছেন৷ ইলেকশন বা অন্য কোনও বড় ইনসিডেন্ট কভার করতে না পারাটা মিস করেন না? প্রশ্নের উত্তরে মিতালির হেসে জবাব, ‘‘একেবারেই যে লাগে না তা বলব না৷ তবে আমি এখন যা করছি, তাতেই খুব খুশি৷ আমার নতুন পরিচয়, আমি এখন মিতালি চায়েওয়ালি৷’’