‘সমাজের তেতো দিকটার স্বাদ পেয়েছি’

379
debjani
দেবযানী সরকার….

মা চেয়েছিলেন পণ দিয়ে দিদির বিয়ে দিতে৷ তখনই জীবনের প্রথম প্রতিবাদী সত্ত্বা গর্জে বেরিয়েছিল নিজের মায়ের বিরুদ্ধে৷ সেই থেকেই মানসিকতায় শান দেওয়া  শুরু৷ পরম যত্নে লালন করা সেই সত্ত্বাই আজ তাঁকে দিয়েছে নতুন পরিচয়৷ হয়ে উঠেছেন নারী সমাজের প্রতিবাদী মুখ৷ রাজ্যের মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন সুনন্দা মুখোপাধ্যায়ের জীবনের গল্প শুনলেন দেবযানী সরকার৷

বাবা ছিলেন রাজ্য সরকারী কর্মচারী৷ সেই সঙ্গে ‘অনুশীলন সমিতি’র একজন সক্রিয় সদস্য৷ তবে মা আদ্যোপান্ত গৃহবধু৷ যাদবপুরের উদ্বাস্তু কলোনিতে বেড়ে ওঠা সুনন্দা দেবীর পারিপার্শ্বিক পরিবেশই তাঁর প্রতিবাদী মানসিকতার ভিত শক্ত করেছিল৷ চারপাশের দৈনন্দিন লড়াইয়ের যাপন চিত্র, সংসারের আর্থিক অনটনে তিনি বুঝেছিলেন জীবনের অনুর্বর জমিতেই তাঁকে ফসল ফলাতে হবে৷ তাই পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশন ও বিভিন্ন কোম্পানির সার্ভের কাজ করে নিজের ও পরিবারের খরচ মেটাতেন৷

নেতাজি নগর কলোনিতে বাংলা অনার্স নিয়ে পড়ার সময়ই সুনন্দা জড়িয়ে পড়েন ছাত্র রাজনীতিতে৷ প্রথমে পিএসইউ-র হয়ে ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হন৷ পরবর্তীতে আরএসপিতে যোগ দেন৷ যদিও নীতিগত কারণে দলের সঙ্গে সম্পর্ক ভাঙতে বাধ্য হন সুনন্দা৷

sunanda1যিনি এখন রাজ্যের নির্যাতিতাদের ভরসার জায়গা সেই সুনন্দা দেবীর রাজনৈতিক জীবনে হেনস্তা হওয়ার ঘটনা কম নয়৷ তিনি বলেন, মহিলারা পুরুষদের পিছনে ফেলে দেবে এখনও পিতৃতান্ত্রিক সমাজ এটা মানতে পারে না৷ তাই রাজনীতি করার সময় সমাজের তেতো দিকটার স্বাদ আমি পেয়ে গিয়েছি৷ এই সংগ্রামের মধ্যেই অবশ্য জীবনের দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করে ফেলেছিলেন৷ তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের পূর্তমন্ত্রী ক্ষিতি গোস্বামীর অর্ধাঙ্গিনী তিনি৷

এপিডিআর-এর মানবাধিকার কর্মী হিসেবে সবসময় অগণতান্ত্রিক কাজকর্মের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন৷ সংসারেও তার প্রতিফলন ঘটে৷ স্বামী গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী থাকা সত্ত্বেও সিঙ্গুর আন্দোলনের সময় তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন সুনন্দা৷ স্বামীর রাজনৈতিক আদর্শ ও নিজের প্রতিবাদী সত্ত্বা, এই দুয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে গিয়ে তাঁর সংসারে এতটুকু আঁচ লাগতে দেননি এই মহিলা৷sunanda2

দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করা সুনন্দা দেবী দুই মেয়েকেও দিয়েছেন সাধারণ জীবনযাত্রার পাঠ৷ সংসার খরচ সামলানোর চাপ থাকায় নামজাদা স্কুলে মেয়েদের পড়াতে পারেননি৷ সাধারণ স্কুলেই মেয়েদের পড়িয়েছেন৷ সুনন্দা দেবী বলেন, আমি কখনই চাইতাম না মেয়েরা নিজেদের মন্ত্রীর মেয়ে হিসেবে ভাবুক৷ তাই সাধারণ মানের জীবনযাত্রাতেই ওদের অভ্যস্ত করেছি৷

সিঙ্গুর আন্দোলনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে থাকার পুরস্কার পেয়েছেন সুনন্দা মুখোপাধ্যায়৷ এখন তিনি রাজ্য মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন৷

সুনন্দা দেবী চেয়েছিলেন শিক্ষকতাকে পেশা হিসাবে বেছে নিতে৷ তাঁর সেই ইচ্ছার পরিসর বেড়েছে৷ ৬২ বছরের এই মহিলা নিজের দুই মেয়ে তো বটেই গোটা নারী সমাজকে শেখাচ্ছেন, অন্যায়ের সঙ্গে কখনই আপোস নয়৷ অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে৷