‘বাহা, পরমেশ্বরী, মেঘলা এই সবকিছুই মিলেমিশে আমি’

96

ইমন, মেঘলা,পরমেশ্বরীদের সৃষ্টিকর্তা এখন রাজ্যের মহিলা কমিশনের প্রধান৷ মেয়েদের ক্ষমতায়ন নিয়েই তাঁর কাজ৷ সন্ধের ড্রয়িংরুমে যাঁর কলম সমাজের বিভিন্ন স্তরের নারীদের গল্প বলেন তাঁর নিজের জীবনের গল্পটা কেমন? ব্যক্তি লীনা গঙ্গোপাধ্যায়কে এবার খুব কাছ থেকে জানলেন দেবযানী সরকার

কলকাতা24×7: প্রায় তিনমাস মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন পদে রয়েছেন৷ এই স্বল্প সময়ে কাজের অভিজ্ঞতা কেমন?
লীনা: এখনও তিনমাস হয়নি৷ তবে এই কয়েকদিনে আমার একটা মিশ্র অভিজ্ঞতা হয়েছে৷ মিশ্র অভিজ্ঞতা এই কারণেই বলছি এমন কিছু কেস আসে যেগুলোর সমস্যা মেটাতে না পারলে খুব হতাশ লাগে৷যেমন ধরুন, পাঁচ বছরের একটা শিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে৷ বাচ্চাটাকে যখন তার মা নিয়ে আসে তখন খুব এতটা কষ্ট হয় বলে বোঝাতে পারব না৷ না হলে এমনি কাজটা খুবই চ্যালেঞ্জিং৷ আর কাজের পরিবেশও ভালো৷

কলকাতা24×7: একদিকে মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সনের পদ অন্যদিকে স্ক্রিপ্ট রাইটিং, এই দুটো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব কিভাবে ব্যালান্স করছেন?
লীনা: স্ক্রিপ্ট রাইটিং বললেও কম বলা হবে৷ আমাকে একটা কোম্পানির দায়িত্ব সামলাতে হয়৷স্ক্রিপ্ট রাইটিংটা সেই কোম্পানির কাজের একটা অংশ৷ আমি মাল্টি টাস্কিং করতে অভ্যস্ত৷ আগেও কলেজে পড়িয়েছি৷ সেইসঙ্গে লেখালিখিও করেছি৷ তাই এত কাজের চাপে আমি একেবারেই ক্লান্ত হই না৷

leena-2কলকাতা24×7: মহিলাদের জন্য কাজ করতে গিয়ে এই দু-আড়াই মাসে কি নতুন কোনও চরিত্রের খোঁজ পেলেন যাঁকে নিয়ে স্ক্রিপ্ট লেখার ইচ্ছা আছে?
লীনা: আগে যে জনারটা দেখেছি সেটা আলাদা কিন্তু এখানে এসে যে জনারটা দেখছি সেটা একটা নতুন, অন্যরকম৷এখানে এসে অসহায়তা চাক্ষুষ করতে পারছি৷ খুব কাছ থেকে অনুভব করতে পারছি৷ এক্ষুনি কিছু লিখছি না৷ তবে ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই লিখব৷

কলকাতা24×7: অধ্যাপনা, স্ক্রিপ্ট রাইটিং না মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সনের পদ, কোন কাজটা বেশী এনজয় করছেন?
লীনা: যখন যে কাজটা করেছি সেটাই ভাল লেগেছে৷ মহিলা কমিশনের কাজটা খুব চ্যালেঞ্জিং৷ কিন্তু লেখালিখি ছাড়া আমি থাকতেই পারব না৷

কলকাতা24×7: দিন দিন আপনার বাইরের কাজের পরিধি বাড়ছে৷এসবের সঙ্গে সংসারের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন কীভাবে?
লীনা: আমি রান্না করতে ভালবাসি৷ বাড়িতে থাকলে অনেক এক্সপেরিমেন্টাল রান্না করি৷ লোকজনকে খাওয়াতেও আমি খুব ভালবাসি৷ কোনও আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে আমার যাওয়া হয় না৷ তাঁরা আমার বাড়িতে আসেন৷ আমি যেকোনও রিলেশনশিপ খুব মেইনটেইন করতে পারি৷ কারণ আমার মনে হয় এই সম্পর্কগুলোই জীবনের জানালা-দরজা৷ এগুলো বন্ধ থাকলে দম বন্ধ হয়ে আমি মরে যাব৷

কলকাতা24×7: মেঘলা, ইমন কিংবা পরমেশ্বরী চরিত্রের সৃষ্টিকর্ত্রী যিনি তাঁর জীবনের গল্পটা কেমন?
লীনা: আমি খুব সাধারণ বাড়ির মেয়ে৷ পড়াশোনাও সাধারণ৷ আমার ফার্স্ট ইয়ারে পড়তে পড়তেই বিয়ে হয়ে যায়৷ তাই বিয়ের পরই আমার পড়াশোনা, কেরিয়ার যা কিছু হয়েছে৷ সবেতেই যে শ্বশুরবাড়ির সমর্থন পেয়েছি তা একেবারেই নয়৷ তাই বুঝতেই পারছেন সবকিছু মসৃণভাবে হয়নি৷ এমনও দিন গেছে হাতে টাকা ছিল না৷ অনেকটা রাস্তা পায়ে হেঁটে গেছি৷ বাস ভাড়া নেই সেটা মুখ ফুটে বলতে পারিনি কখনও৷ ভাবতাম যাঁর দায়িত্ব সে নিজে থেকে দেবে৷ শ্বশুরবাড়িতে কোনও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ছিলনা বলে একটু স্ট্রাগল করতে হয়েছে৷
আমাদের বাড়িতে পড়াশোনার একটা আবহ ছিল৷ বাবার বিয়েতে মত ছিল না৷ জোর করেই প্রায় বিয়েটা করেছিলাম৷
কিন্তু আমার মধ্যে একটা অদম্য জেদ ছিল৷ আমি মনে করি কারোর যদি কিছু একটা করার তাগিদ থাকে তাহলে পৃথিবীর কোনও বাধাই তাকে আটকাতে পারবে না৷ আমাকেও পারেনি৷ পরিবারে আমি অনেক সম্যার শিকার হয়েছি৷ কিন্তু সেটা ওভারকামও করতে পেরেছি৷

leena-3

কলকাতা24×7: আপনি মেয়েদের সম্মানের জন্য লড়াই করছেন…আপনাকে কোনওদিন কোথাও হেনস্তা হতে হয়েছে?
লীনা: কর্মক্ষেত্রে কখনও হেনস্তা হতে হয়নি আমাকে৷ বরং অনেকের সহযোগিতা পেয়েছি৷ অনেক আদর পেয়েছি৷

কলকাতা24×7: একটা ইন্টারভিউতে পড়েছিলাম ‘সত্যি প্রেমের গল্প’ আপনার প্রথম লেখা৷ আপনার নিজের জীবনের গল্প৷পরে যে চরিত্রগুলো লিখেছেন সেখানো কারোর সঙ্গে আপনার মিল রয়েছে?
লীনা: হ্যাঁ৷ তখন আমি একটু ছোটই ছিলাম৷ একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে বয়সে বড় একটি ছেলেকে দেখে খুব ভাল লাগে৷ যাকে বলে লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট৷ আমাদের পরে আর কখনও দেখা হয়নি৷ সেই ঘটনাটাই ‘সত্যি প্রেমের গল্প’ হয়ে উঠেছিল৷ তবে বাহা, পরমেশ্বরী, মেঘলা এই সবকিছুই মিলেমিশে আমি৷ শুধু আমি কেন এই চরিত্রগুলোর সঙ্গে অনেক মেয়েরাই নিজেদের রিলেট করতে পারে৷

কলকাতা24×7: ব্যক্তি লীনা গঙ্গোপাধ্যায় কেমন?
লীনা: আমি খুব ধৈর্য্যশীল, সহনশীল আর খুব পজিটিভ৷ তবে আমার খুব ইগো আছে৷ বলতে পারেন একধরণের অহঙ্কার৷ জাগতিক কোনও বিষয়ে নিয়ে কোনও অহঙ্কার নেই৷ টাকাপয়সা, গাড়ি-বাড়ি নিয়ে মানুষ বিচার করি না৷ তবে আমার আত্মসম্মানে ঘা লাগলে আমি একমুহূর্ত সেখানে থাকি৷

কলকাতা24×7: আপনার কাছে নারী স্বাধীনতার সংজ্ঞা কী?
লীনা: প্রাথমিকভাবে মনে হয় অর্থনৈতিক স্বাধীনতা৷কারণ অর্থ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে, অর্থ থেকে ক্ষমতা তৈরি হয়৷ নারী অনেকক্ষেত্রে অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হতে পারেনি বলে ক্ষমতা পুরুষতন্ত্রের কাছে গেছে এবং ক্ষমতায়ন হয়েছে৷ সুতরাং আমার মনে হয়, শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতায় জোর দিলে অনেক সমস্যা কমে যায়৷

কলকাতা24×7: আপনার কলম থেকে মেয়েদের কথা বেরোয়৷ মহিলাদের উদ্দেশ্যে আপনার পরামর্শ কী? বিশেষ করে যাঁরা স্ট্রাগল করছেন…
লীনা: নিজের উপর ভরসা রাখতে হবে৷ ফোকাসড হতে হবে৷ আর অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে হবে৷তাহলেই সব চরাই-উতরাই পেরনো সম্ভব৷

কলকাতা24×7: মেয়েদের জন্য আগামী দিনে নতুন কিছু করার কোনও পরিকল্পনা আছে?
লীনা: আমি পরিকল্পনা করে কোনওদিনই কিছু করিনি৷আমার জীবনে কোনও লক্ষ্য ছিলনা, এখনও নেই৷আমি শুধু এটা জানতাম যে আমি বসে থাকব না৷ কিছু একটা করব৷প্রতিমুহূর্তে একটা অদৃষ্ট আমার হাত এগিয়ে নিয়ে গেছে৷ আমিও শিখতে শিখতে গেছি৷ তাই এব্যাপারে কিছুই ভাবিনি৷

leena-4কলকাতা24×7: অবসর সময় কীভাবে কাটান?
লীনা: সিনেমা-সিরিয়াল একেবারেই দেখি না৷ প্রচুর দেশ-বিদেশের বই পড়ি৷ আর সেরকম অবসর কোথায়? 24×7 আমার কাজ৷সকাল ১০-১টা পর্যন্ত আমি স্ক্রিপ্ট নিয়ে থাকি৷২টো থেকে কমিশনে৷এখন একসঙ্গে ৬টা মেগার স্ক্রিপ্ট করছি৷আমার ছবি ‘মাটি’ ডিসেম্বরে রিলিজ করবে৷

কলকাতা24×7: আপনার ছেলে অর্ক গঙ্গোপাধ্যায়ের ছবি ‘খোঁজ’৷ ছেলেকে ছবি নিয়ে কোনও পরামর্শ দেন?
লীনা: একদমই না৷ মা-ছেলের চিন্তা-ভাবনা একদম আলাদা৷ আমরা কেউ কারোর ক্রিয়েটিভ কাজের ব্যাপারে নাক গলাই না৷

কলকাতা24×7: বিনোদন জগৎ থেকে প্রশাসনের শীর্ষস্তরে…সক্রিয় রাজনীতিতে আসার কোনও ইচ্ছে আছে?
আমি আগেই বলেছি আমার জীবনে কোনও পরিকল্পনা নেই৷ তবে রাজনীতিতে আমার কোনও আগ্রহ নেই৷আসলে আমি খুব ওপেন মাইনন্ডেড৷ তবে আমি এটা বলছি না যে যাঁরা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত তাঁরা ছোট মনের৷ আসলে আমার চরিত্রের সঙ্গে রাজনীতিটা ঠিক যায় না৷