‘খোরপোষ চাওয়াটা অনেকটা পণ নেওয়ার মতো’

350

ডিভোর্সের পর খোরপোষ দাবি মহিলাদের আইনত অধিকার। এই আইনকে অন্যচোখে দেখলেন সাংবাদিক নবনীতা ভট্টাচার্য

নবনীতা ভট্টাচার্য
নবনীতা ভট্টাচার্য

যাকে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা। সে যতই সুন্দর হোক কিছুতেই মন ওঠে না। কিন্তু তার টাকা পয়সাটা নিতে খারাপ লাগে না। ওই খোরপোষ, বালিশ-বিছানা, এমনকি বিয়ের সময় বাথরুমে লাগানো গিজারটা পর্যন্ত বগলদাবা করে নিয়ে যেতে হয়। যখন ছেড়েই দিচ্ছি তখন এতো রাগ পুষে রেখে কি লাভ? নাকি সেখানেও টাকা পয়সা বাগিয়ে নেওয়ার লোভটা বড় হয়ে ওঠে!

বিচ্ছেদ আমি তখনই চাই যখন আমরা আর একে অপরের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারি না। একসঙ্গে থাকতে পারছি না। দমবন্ধ লাগছে। তার পিছনে নতুন প্রেম, পুরানো প্রেম, মতের অমিল, অশিক্ষা যে কোনও কারণই থাকতে পারে। মদ খাওয়া, রাত করে বাড়ি ফেরা, গায়ে হাত তোলা ইত্যাদি ইত্যাদি। ব্যাস এই টুকুই তো। তা আলাদা হয়ে যাওয়ার কারণটা তো পরিষ্কার। তা তার জন্য এত কান্নাকাটি, হইচই, তামঝামের কি আছে? তবে সেই তাকে ছেড়ে দিয়ে যদি তার পয়সাতে ফুটানি চলে দুজনের ক্ষেত্রেই তবে আপনি মূর্খের স্বর্গে বাস করছে। এটা অনেকটা পণ নিয়ে বিয়ে করার মতো বিপদজন। যে নেয় আর তার পরে যে তাকেই বিয়ে করে তারা দুজনে সমান অপরাধী।

যাই হোক, যদি ভেবে থাকেন বিশাল খোরপোষ নিয়ে কাউকে টাইট দিলেন তাহলে জেনে রাখবেন বিচ্ছেদের পরে আপনি যে জীবনটা কাটাচ্ছেন সেটা ওই চরণ বাঁকার কল্যাণে। আহা, বলি বাচ্চা-কাচ্চার দায়িত্ব নেবে কে? কেন আপনি! পারবেন না? না পারলে যা যা পারবেন তাই করুন। না পারলে বন্ধুত্ব পূর্ণ সহবস্থানে বাচ্ছাদের বাপের কাছেই রাখুন। নিজেও বন্ধু থাকুন। পরবর্তী প্রজন্মের ভালো থাকার জন্য সম্পর্ক নিংড়ে নেবেন না। তাহলে আপনার পরের প্রজন্ম ও আপনি দুজনেই কষ্ট পাবেন। সম্পর্ক যে জায়গাতে এসে মিলছে না সেখানেই দাঁড়ি টানুন। আর আগে টানবেন না। নচেৎ দাঁত, নখ বেরিয়ে ছিঁড়েখুঁড়ে একসা হয়ে যাবে। তবে এত কিছু করতে একটু সাহস আর নিজের প্রতি বিশ্বাস থাকা জরুরি। যে বিশ্বাসে আমরা মনে করি ছেলে আর মেয়ে সমান। ঠিক সেই বিশ্বাসে বিচ্ছেদের পর নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। লোভটা একটু কমাতে হবে।

‘আমার’ বলে আমাদের মেয়েদের কিছু হয় না। যতক্ষণ না নিজের মাথার ওপর ছাদটা থাকে। সেটা নিজের পয়সাতে কেনা হোক বা ভাড়া করা। অবশ্য সন্তান তার সঙ্গে থাকতেই পারে। সন্তান তার বল ভরসা। তবে বিচ্ছেদটা যেই টানুক একে অপরের সঙ্গে কথা বলাটা জরুরি। মা, বাবা, পাড়া-পড়শি নয়। নিজেদের মধ্যে কথা বলাটা জরুরি। একে অপরের সঙ্গে বন্ধুর মত মিশুন। কারণ যে জায়গা থকে মনের ভেদাভেদ স্পষ্ট ঠিক সেখান থেকেই বুঝে নিতে হবে এই সম্পর্কটা আর এভাবে চলবে না। তৎক্ষণাৎ পরবর্তী পদক্ষেপ ভাবতে থাকুন। চট করে বন্ধু হয়ে যান। জানি খুব কঠিন। কিন্তু এটা একমাত্র সম্পর্ক যেখানে এসে লেনদেন চিন্তা ভাবনা গতি পাল্টায়। দর কষাকষি করবেন না। তিক্ততা বাড়ে মন কষাকষিতে।
মনে রাখবেন বিয়ের মতো ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে সমাজ ফাটকা খেলতে পারে, বিচ্ছেদ তো আরও মুখরোচক। তাই যতটা পারেন বিচ্ছেদকে ব্যক্তিগত রাখুন। দুটো মানুষের এক সঙ্গে থাকতে না পারার কষ্ট ওই দুজন মানুষ ছাড়া অন্য কেউ বুঝবে না। ভালোবেসেই যেমন একসঙ্গে থাকতে এসেছিলেন ঠিক তেমনই ভালবেসেই আলাদা থাকার সিদ্ধান্ত নিন। মনে রাখবেন কোনও কিছুই চিরন্তন নয়।

আর সত্যি যদি আগামী দিনের জন্য সম্পর্ক বাঁচিয়ে রাখতে চান তবে চেষ্টা করুন বন্ধু হতে। এর চেয়ে ভালো সম্পর্ক এই পৃথিবীতে খুজে পাওয়া ভার। যে মুহূর্তে একে অপরকে ছেড়ে দিলেন ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে দেখবেন আমার বলে আর কোনও কিছুই আপনার ভালো লাগছে না। আর সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে টাকা পয়সার লোভ টাকে সরিয়ে রেখে ভিতরের বন্ধুটাকে টেনে বার করে আনুন। সবই সম্ভব যদি আপনি চান শুধুই ভালোবাসতে। তবে ব্যাপারটা এতো সোজা নয় জানি। উকিল, ডাক্তার, মোক্তার, বাবা, মা সবাই বলবে নিজের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে একটা মোটা টাকা হেঁকে ফেল দেখি।

এখানে জানবেন আপনি বাদ দিয়ে আর সবার স্বার্থ জড়িত। একটু ভেবে দেখবেন বন্ধুরা। তবে টাকা যদি সুরক্ষা দেয় তবে আপনার উচিত ছিলও পড়াশোনা শেষে উপার্জন করা। সে বোধ যখন তৈরি হয়নি তখন নয় সেই বোধ তৈরি করুন। আর নয় বিচ্ছেদ না মানিয়ে টানিয়ে থাকুন। সমাজ যেমন চায়। আধুনিকতা পোশাকে নয় চিন্তায় আনুন। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যার কাছ থেকে বিচ্ছেদ চেয়ে নিলেন দেখবেন হয়ত কাল ভোরে তার মুখটাই আপনার সবচেয়ে আগে মনে পড়ল। কারণ লেনদেনের সম্পর্কটা হারিয়ে গেছে।