আমি সৃষ্টি স্বরূপিনী…

614

সকলের কাছে একথা জানা যে ত্রেতা যুগে রামচন্দ্র রাবণ বধের জন্য দেবী শ্রী শ্রী চন্ডির আকাল বোধন করেছিলেন শরতের প্রারম্ভে। নয় রাত্রি জুড়ে রামচন্দ্র দেবীর আরাধনা করেন, দেবী তুষ্ট হয়ে তাকে আশীর্বাদ করেন, বিজয়া দশমীতে অশুভ শক্তির পরাজয় করে রামচন্দ্র সীতাকে উদ্ধার করেন।

এতো অকাল বোধনের পরিচিত কাহিনী। কিন্তু যে দেবীর প্রসাদে রামচন্দ্র বিজয় লাভ করেছিলেন সেই দেবীতত্ত্ব জানতে হলে শ্রী শ্রী চন্ডির প্রতিটি শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থকে হৃদয়ঙ্গম করতে হবে।

শ্রী শ্রী চন্ডিতে বর্ণিত আছে, সৃষ্টির লয় কালে বিষ্ণু চিরনিদ্রায় ছিলেন তখন এই ব্রহ্মান্ডের শক্তি স্বরূপিনী দেবী মহামায়া যিনি নিরাকার শক্তিরূপে শ্রী বিষ্ণুর নেত্রে নিদ্রা রূপে অবস্থান করছিলেন। অর্থাৎ দেবীর কালরাত্রী, ঘোর প্রলয় অন্ধকারে তাঁর প্রকাশ। নিরাকারের সাধনার কথা বহু ধর্মের মূল কথা। শাস্ত্রে দেবীর কল্পনা নিরাকারে করা হয়েছে। অথচ তাঁকে দশটি হাতে স্ত্রীরূপে কল্পনা করে খড় বাঁশ মাটির মুর্তি তৈরী করে নানা অলঙ্কারে আবৃত করে আরাধনা করা হয়। কেন এই নিয়ম? এই উত্তরও শ্রী শ্রী চন্ডিতে বর্ণিত আছে।

ঋক মন্ত্রে নিজের পরিচয় ঘোষণা করে দেবী বলেছে, ” আমি দুর্গা, আমি কখনও বারি স্বরূপিনী, কখনও অগ্নি স্বরূপিনী, আমি বিবর্ণ বায়ু, আমি নিদ্রা, ঘোর আন্ধকার স্বরূপিনী…. আমি ত্রিলোকে সমস্ত বিরাজমান। সৃষ্টির বিনাশকালে আমি প্রলয় স্বরূপিনী, আবার আমি সৃষ্টি স্বরূপিনী।” অর্থাৎ দেবীর মধ্যে নিহিত সৃষ্টিতত্ত্ব। তিনি প্রকৃতিরূপা, অশুভ শক্তির বিনাশ কালে তাকে দেবগন নিজ নিজ তেজ ও শক্তি প্রভা দ্বারা আবাহন করেছিলেন।

যেহেতু তিনি সৃষ্টির প্রধান শক্তি, বারি,আগ্নি,মরুত,ভূমি ও আলোক এই পঞ্চতত্ত্ব স্বরূপিনী তিনি। তাই তিনি নিরাকার তবে তার অস্তিত্ব আছে। সৃষ্টি রক্ষার্থে তিনি নারীর রূপধারন করেন। নারী রূপে তার প্রকাশ। তাই শ্রী শ্রী চন্ডিতে বর্ণিত আছে যেহেতু নিরাকার থেকে সাকারের কল্পনা করা আছে তাও নারী রূপে, তাই শ্রী চন্ডির আরাধনার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসাবে কোন ছোট শিশু কন্যার মধ্যে দিয়ে তার রূপ কল্পনা করা হয়। শাস্ত্রে বর্ণিত আছে এক থেকে ১৬ বছর বয়সের অবিবাহিত শিশু কন্যার মধ্যে দিয়ে দেবীকে নানা রূপে কল্পনা করে আরাধনা করা হয়। একজন শিশু কন্যা তার মধ্যে দিয়ে মহাশক্তিকে আবাহন করা হয়।

শুধু ভারতে নয় সুদূর নেপালে চৈনিক তন্ত্রে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। সংস্কৃতে কুমারী কথার অর্থ হল রাজকন্যা। নেপালে ও তিব্বতে শুধুমাত্র উচ্চবংশ জাত মেয়েদেরকে কুমারী হিসাবে পুজো করা হয়। কুমারী হিসাবে সেই বিশেষ লক্ষণযুক্ত মেয়েটিকে একদিনের জন্য দেবী হিসাবে পুজা করা হয়। তবে সাধারণত পাঁচ বছরের কম মেয়েকে কুমারী হিসাবে কল্পনা করা হয়। আসলে কুমারী তত্ত্বের সঙ্গে তন্ত্রসাধনার বিশাল সম্পর্ক আছে। ভারত-চিন সহ যে সমস্ত দেশে তন্ত্র সাধনার উৎস আছে সেসব দেশে কুমারীর রূপে দেবীর পুজোর অস্তিত্ব দেখা যায়।

অসমের নীল পর্বতে কামাক্ষ্যা মন্দিরে দেবী কুমারী রূপে পুজিতা হন। কথায় আছে শিব পত্নী সতীর দেহত্যাগের পর আসামের কামরূপ প্রদেশের নীল পর্বতের চূড়ায় কামাক্ষ্যা মন্দিরে তাঁর দেহের যোনি অংশটা পরেছিল। কামদেব নাকী দেবীর প্রসাদে শিবের অভিশাপ মুক্ত হয়ে কামাক্ষ্যা মন্দির নির্মান করে দেন। কামাক্ষ্যা মন্দিরে দেবী দুর্গা রূপে অবস্থান করেন এবং তিনি ষোড়শী, তিনি কুমারী কন্যা হিসাবে পুজিত হন। কুমারীকে এক একটি বয়সে এক একটি নামে পুজা করা হয়। চার বছর বয়সে তাঁকে “কালিকা” বলে, ছয় বছর বয়সে “উমা”, সাত বছর বয়সের কুমারীকে বলা হয় “মালিনী”, আট বছর বয়সে তিনি “কুব্জিকা”, নয় বছর বয়সে “কলাসান্দ্রবা”, দশ বছর বয়সের কুমারীকে বলা হয় “অপরাজিতা”। এভাবে ষোল বছর বয়স পর্যন্ত কুমারীদের বিভিন্ন নামে পুজা করা হয়।

স্বামী বিবেকানন্দের প্রেরণায় ১৯০১ সালে বেলুড় মঠে শারদোৎসবে চালু হয় কুমারী পুজো অষ্টমী তিথিতে। স্বামীজীর মূল মন্ত্র ছিল, জীবনের অস্তিত্বে মধ্যে ইশ্বরের সন্ধান। তিনি মনে করতেন মাতৃরূপ প্রতিটি নারীর মধ্যে আছে। নারীর স্বভাবজাত বিষয় “কুমারী” তাই দেবীর কাল্পনিক জীবন্ত রূপ। শারদোৎসবের প্রারম্ভে সেই কুমারীরূপী দেবীকে পুজার মধ্যে দিয়ে জীবের পুজা, মনুষত্বের পুজা এর মধ্যে নিহিত আছে। আসলে ধর্মের বীজ নিহিত আছে চেতনা ও মনুষত্বের মধ্যে। কিন্তু ধর্মের এই সরল তত্ত্ব ক্রমশ জটিল হয় অশিক্ষিত মানুষের হস্তক্ষেপে। তাই কুমারী পুজোর বদলে হয় সতীদাহের মতো প্রথা। ধর্মের নিগূঢ় তত্ত্বের বিশ্লেষণ এত সল্প পরিসরে সম্ভব নয়। চন্ডীর ব্যাখ্যাও সম্ভব নয় তবে কুমারী পুজোর মধ্যে দিয়ে ধর্মাচরনের সঙ্গে সঙ্গে সমাজে নারীর মর্যাদা স্থির করা যেতে পারে।

সঞ্জীব চট্যোপাধ্যায়ের কথায়, ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বলতেন-” শুদ্ধ কুমারীদের পুজো করতে পারলে আমাদের মন প্রাণ শুদ্ধ হয়।” স্বামী বিবেকানন্দ কন্যা রূপে মাতৃ আরাধনার প্রচলন করেন। চন্ডিতে বর্ণিত আছে প্রতিটি শুদ্ধ নারী প্রকৃতি স্বরূপা। প্রতিটি নারীর অন্তরে তাঁর অবস্থান। তাই কুমারী পুজার প্রচলন বহুকাল আগে থেকে। তন্ত্র মতে কুমারী পুজার আরও বেশি গুরুত্ব দেখা যায়। কুমারী পুজোর কথা সেখানেই বেশী আছে। প্রতিটি নারীকে ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ দেব মাতৃ জ্ঞানে পুজা করতেন তাই প্রতিটি নারীকে আমি সন্মান করি ও মাতৃ জ্ঞানে দেখি”।