প্রতিমার প্রাণদাত্রী যখন রাজপথে প্রতিবাদী

48

মধ্যরাত পার করে মহানগর যখন ঘুমিয়ে থাকে, তখন তাঁর হাতে প্রাণ পায় দেবীমূর্তি৷ প্রতিবাদী প্রতিমা শিল্পী থেকে সুগৃহিনী তিনি৷ দাপুটে এই মহিলাকে মান্যি করে গোটা কুমোরটুলি৷ শিল্পী কাঞ্চি পাল এমনই৷ এবারের অনন্যায় রইল তাঁর কথা৷ শিল্পীর সঙ্গে কথা বললেন দেবযানী সরকার

দুর্গা কৈলাসে যেতে না যেতেই লক্ষ্মী এসে হাজির৷ তার পেছনেই লাইন লাগিয়ে আছেন কালী, জগদ্ধাত্রীরা ৷ তাই কুমোরটুলির শিল্পীদের এখন দম ফেলার সময় নেই৷ যেমন শিল্পী কাঞ্চি পাল৷ ঠাকুর গড়া, ব্যবসা সামলেও সুগৃহিনীর মতো সংসার সামলাচ্ছেন৷

লম্বা-চওড়া, দাপুটে এই মহিলাকে মান্যি করে গোটা কুমোরটুলি৷ শুধু কুমোরটুলি নয়, কলকাতার প্রতিমা শিল্পীদের মহলেও কাঞ্চী পালের যথেষ্ট নামডাক৷ প্রথম এবং একমাত্র মহিলা প্রতিমা শিল্পী যাঁর ঝুলিতে রয়েছে এশিয়ান পেন্টস ‘শারদ সম্মান’৷ এছাড়াও অন্যান্য বহু পুরস্কার৷ এবছরও তাঁর তিনটে পুজো

পাঁচ বছর বয়সে মা অর্চনা পালের কাছে ঠাকুর গড়ার হাতেখড়ি৷ তারপর বাবা নৃসিংহ পালের কাছে তালিম পেয়ে দক্ষ প্রতিমা শিল্পী হয়ে ওঠেন কাঞ্চি৷ তাঁর তৈরি সাবেকি প্রতিমা থেকে থিমের ঠাকুর, সবই দর্শনার্থীদের মন ছুঁয়ে যায়৷

১৫ বছর আগে রথতলার নওয়াপাড়ায় প্রথম ১৭ ফুটের দুর্গা প্রতিমা গড়েছিলেন কাঞ্চিদেবী৷ সেইসময় ওটাই ছিল বড় দুর্গা৷ এরপর সল্টলেকের বি জে ব্লক, দক্ষিণ কলকাতার নেপাল ভট্টাচার্য স্ট্রিট ক্লাবের দুর্গা প্রতিমা তৈরি করেছেন৷

২০১৪ সালে কাঞ্চি পালের তৈরি নেপাল ভট্টাচার্য স্ট্রিট ক্লাবের দুর্গা প্রতিমা এশিয়ান পেন্টসের শারদ সম্মান পায়৷ ওটাই ছিল কাঞ্চিদেবীর জীবনে প্রথম পুরস্কার৷ এখনও সেইদিনটার কথা ভুলতে পারেননি তিনি৷

শিল্পী-কাঞ্চি পাল
শিল্পী-কাঞ্চি পাল

কাঞ্চীদেবীর কথায়, জীবনের প্রথম পুরস্কার৷ উফ কী যে আনন্দ হয়েছিল! ৫০০ জনকে নেমতন্ন করে ফ্রায়েড রাইস আর পাঁঠার মাংস খাইয়েছিলাম৷ এরপরও অনেক পুরস্কার পেয়েছি৷ খুব ভাল লেগেছে তবে ওই আনন্দটা একেবারে অন্যরকম ছিল৷ আসলে এখন অনেকে পুরস্কার দেয়৷ কিন্তু এখনও এশিয়ান পেন্টেসের পুরস্কারের মাপকাঠিতে পুজোগুলোকে বিচার করা হয়৷

এবছর ৪২টি দুর্গা প্রতিমা গড়েছেন কাঞ্চিদেবী৷ ২০ জন কারিগর থাকলেও নিজেই সব সামলান তিনি৷ কাঞ্চিদেবীর কথায়, বাঁশ, খড় আনা থেকে ঠাকুর তৈরি-সবকিছুতে নিজে হাত না লাগালে শান্তি পাই না৷ এই লক্ষ্মীপুজো, কালীপুজোর সময় আমি নিজে দোকানে বসে ঠাকুর বিক্রি করি৷

চল্লিশ ছুঁই ছুঁই এই মহিলা একদিকে যেমন তাঁর শিল্পীসত্ত্বা, ব্যবসা ধরে রেখেছেন অন্যদিকে সুগৃহীনির মতো সংসারকেও আগলে রেখেছেন৷ স্বামী কর্মসূত্রে বিদেশে থাকেন, তাই নিজেই বাজার-দোকান সব করেন৷বাড়ির সদস্যদের পাশাপাশি দু’বেলা রান্না করে খাওয়ান কারিগরদের৷

রাতে সবাইকে খাইয়ে দাইয়ে তারপর নিজের সৃষ্টির সঙ্গে একান্তে বসেন কাঞ্চীদেবী৷ রাত ১২-১টা পর্যন্ত নিজের স্টুডিওতে একটু একটু করে সৃষ্টি করেন দুর্গা, লক্ষ্মী, স্বরস্বতীদের৷

কাঞ্চীদেবীর আরও একটা পরিচয় আছে৷ কুমোরটুলিতে সবাই তাঁকে জানে একজন প্রতিবাদী নারী হিসেবে৷ কুমোরটুলির মৃৎ শিল্পীদের পুনর্বাসন নিয়ে যখন রাজ্য-রাজনীতি তোলপাড় হয়েছিল তখন আন্দোলনের প্রথম সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি৷

প্রতিমা গড়ার কারিগর অনেক আছেন৷ কাঞ্চীদেবী তাঁদের একজন-অবশ্যই অন্যতমা৷ কুমোরটুলির গর্ব৷

ছবি- শশী ঘোষ