খিড়কি থেকে সিংহদুয়ার নয়, পৃথিবী অনেক বড়…

91

বিয়ের পর অনেক সময় একপ্রকার বাধ্য হয়েই মেয়েদের চাকরি ছাড়তে হয়৷কেউ কেই বলে, “অনেক তো হল৷ এবার ক্ষ্যান্ত হও৷ ঘর সংসার করো৷ টাকা তো বর কামাচ্ছেই৷ মাসের শেষে লকারে ভালো ক্যাশই জমা পড়ে৷ তাহলে অভাবটা কোথায়?” অভাবটা মনে৷ মনের খিদে যে মেটে না৷ চাকরি তো শুধু কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা পকেটে ঢোকায়, তা নয়৷ মানসিক সুখও দেয়৷লিখলেন বিশাখা পাল

কাল থেকে তিতিরের মনটা খারাপ৷ সচরাচর এমন হয় না৷ তিতির খুব প্রাণবন্ত মেয়ে৷ কিন্তু কাল বিয়ের কথা পাকা হওয়ার পর থেকেই মনমরা হয়ে গেছে মেয়েটা৷ হবু বরকে দেখে নয়৷ তিতিরের তার কথা ভালো লাগেনি৷ এমনিতে সে বাবামায়ের কথা বড় একটা অমান্য করে না৷ বাধ্য মেয়ে বলে তার একটা সুনাম আছে আত্মীয়মহলে৷ কিন্তু এখন কথা একেবারেই আলাদা৷ বাবামায়ের কথা মেনে নিয়ে বাধ্য মেয়ের মতো পিঁড়িতে বসে পড়লেই তো মুশকিল৷ তিতির স্বপ্ন এখানেই খানখান হয়ে যাবে৷ বিয়ের পর বরের যদি মনস্তত্ব না বদলায়, তিতির চাকরি করবে কী করে?

সমস্যাটা একা তিতিরের নয়৷ একাধিক মেয়ের৷ পড়াশোনা চালাতে চালাতেই চোখ থাকে চাকরির বাজারের দিকে৷ কোনওভাবে একটা চাকরি পেতেই হবে৷ পরিবারের পেট চালাতে যদি নাও হয়, অন্তত নিজের জন্য৷ দিনের শেষে ক্লান্ত শরীরে যদি একটা কোল্ড ড্রিঙ্কস খেতে ইচ্ছা করে, সেটা যেন নিজের টাকায় কিনে খাওয়া যায়৷

এমন মানসিকতা থাকলে চাকরি তো বাঞ্ছনীয়৷ আর পেয়ে গেলে পোয়াবারো৷ ছাড়ার কোনও প্রশ্নই ওঠে না৷ বরং ধাপে ধাপে এগিয়ে চলা৷ এমন সময় জীবনে কোনও পুরুষ যদি এসে বলে, “চাকরি ছাড়ো, সংসার করো৷” তাহলে কি মেনে নেওয়া যায়? অবশ্য কেউ বলবে, “অনেক তো হল৷ এবার ক্ষ্যান্ত হও৷ ঘর সংসার করো৷ টাকা তো বর কামাচ্ছেই৷ মাসের শেষে লকারে ভালো ক্যাশই জমা পড়ে৷ তাহলে অভাবটা কোথায়?” অভাবটা মনে৷ মনের খিদে যে মেটে না৷ চাকরি তো শুধু কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা পকেটে ঢোকায়, তা নয়৷ মানসিক সুখও দেয়৷ তার কি আর বিকল্প চলে? বর যদি লাখ টাকাও ইমকাম করে, তবু মনে হয়, “ইস! ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ক্রেডিটটা যদি ওর অ্যাকাউন্ট থেকে না এসে আমার নিজের পারিশ্রমিক হত!!” আর তাছাড়া এমনি এমনি তো আর প্রবাদ চালু হয়নি- যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে৷ তবে সমস্যাটা কোথায়?

এমন মেয়ের সংখ্যা সমাজে কম নেই৷ তবে বিয়ের পরই অনেক সময় একপ্রকার বাধ্য হয়ে মেয়েদের চাকরি ছাড়তে হয়৷ আরে বাপু, যদি কোনও মেয়ে ঘরেবাইরে সমান দক্ষ হয়, তবে তো ভালোই৷ চাকরি ছাড়ার দরকার কী? পুরুষদেরও এদিকে ফায়দা আছে৷ এক তো ঘরে এক্সট্রা টাকা ঢুকবে৷ তার উপর আবার কারোর সঙ্গে পরিচয় করানোর সময় সে অনায়াসে বলতে পারবে, “আমার মিসেস৷ ও ওমুক কোম্পানিতে তমুক পোস্টে আছে৷” এতে মান বাড়বে বই কমবে না৷ উলটো দিক থেকে প্রতিক্রিয়া আসবে, “বাহ্৷” আসবে নয়৷ এমন প্রতিক্রিয়া আসতে বাধ্য৷ আর তাছাড়া কথায় বলে না, অলস মস্তিস্ক শয়তানের বাসা৷ যদি বউ বাড়িতে বসে শুধু হোঁশেল ঠেলে, তাহলে তার কাছে অতিরিক্ত সময় থাকবে৷ তার উপর বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে পরিচিতি থাকবে না৷ তখন বরের মহিলা কলিগদের নিয়ে মনে সন্দেহ দানা বাঁধতেই পারে৷ যদিও সেই সংখ্যাটা অতিমাত্রায় নগণ্য৷ কিন্তু হয় না কি? তার চেয়ে স্বামী স্ত্রী মিলে অফিস বেরোলে তো একূল ওকূল, দুকূলই রক্ষা হয়৷ পরিবারের বাইরেও নিজস্ব একটা জগৎ তৈরি হয়। তখন বাজে দিকে মন দেওয়ার সময় কোথায়?

তবে এক্ষেত্রে কিন্তু স্বামীকে অতি অবশ্যই স্ত্রীকে সমর্থন করতে হবে৷ বিয়ের সময় আগুনের সামনে তোতাপাখির মতো যে মন্ত্রগুলো আউড়ান, “যদিদং হৃদয়ং তব, তদিদং হৃদয়ং মম”, সেটা প্রমাণ করার আসল জায়গা তো এটাই৷ স্ত্রীয়ের হৃদয় যদি স্বামীর হয় আর তদ্বিপরীত, তাহলে এমন না করার তো কোনও কারণ নেই৷ স্ত্রী যদি চাকুরিতা হন, তাহলে তাকে কাজের মধ্যে ডুবে থাকতে হয়। সংসার ও কর্মক্ষেত্র দু’জায়গা একসঙ্গে সামলানো মুখের কথা নয়। পরিবার, বিশেষত সন্তানকে সময় দেওয়া৷ তখন বাবা মা দুজনকেই সমানভাবে দায়িত্ব নিতে হয়।

তবে এর মানে এই নয়, এটকুতে পিছিয়ে এসে চাকরিক্ষেত্রে পদার্পণ করবেন না৷ নিশ্চিন্তে করুন৷ তবে হ্যাঁ৷ এমন চাকরি করুন যাতে আপনি দুদিক সামলাতে পারবেন৷ যেমন চেষ্টা করুন দুজনে একই শহরে চাকরি খোঁজার৷ কারণ দূরত্ব বাড়লে দুজনের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি বাড়তে পারে৷ অফিসের কাজ কখনও বাড়ি পর্যন্ত টেনে আনবেন না৷ অতিরিক্ত চাপ থাকলে ওভারটাইম করে সেটি অফিসেই সেরে আসার চেষ্টা করুন৷ বিয়ের পর মহিলাদের চাকরি ছেড়ে দেওয়ার একটা প্রধান কারণ থাকে সন্তানকে বড় করে তোলা৷ তারা যত বড় হতে থাকে, দায়িত্ব তত বাড়তে থাকে৷ তাদের পড়াশোনা তো একটা পাহাড়প্রমাণ দায়িত্ব৷ তার উপর আছে পড়াশোনার বাইরে হাজার জিনিস৷ যেমন কেউ আঁকতে ভালোবাসে, কেউ গান শিখতে চায়, কারোর হয়তো মার্শাল আর্টের দিকে ঝোঁক৷ এমন থাকলে তাকে তো সেই স্কুলে ভর্তি করতে হবে৷ সেটার পিছনেও সময় দিতে হবে৷ কিন্তু সময় তো আর বাড়ন্ত নয়৷ তবে উপায় আছে৷ আজকাল ছেলেমেয়েরা অবশ্য অনেক ম্যাচিওর৷ মায়ের সমস্যা তারা অনেকটাই বোঝে৷ কিন্তু আপনাকেও তাদের সাহায্য করতে হবে৷ সন্তানকে আগে থেকেই পরিস্থিতির সঙ্গে ধাতস্থ হতে দিন৷ তাকে এমনভাবে তৈরি করুন যাতে সে আপনাকে ছেড়ে অন্তত কিছুটা সময় থাকতে পারে৷ কিন্তঅফিস থেকে বাড়ি ফিরে অবশ্যই সন্তানকে সময় দিন৷ তখন আর কোনওদিকে তাকানো নয়৷

প্রতিকূলতা আসবে৷ আসতে বাধ্য৷ কিন্তু যদি আপনি কষ্ট না করেন, তবে কেষ্ট পাবেন না কোনওদিনই৷ সিদ্ধান্ত আপনাকেই নিতে হবে৷ ঠিক করতে হবে খিড়কে থেকে সিংহদুয়ার পর্যন্তই আপনার পৃথিবী? নাকি চরৈবেতি, চরৈবেতি…