সোশ্যাল মিডিয়ায় শাড়ি ম্যানিয়া

4168

saree1এই ২০১৫ সালে কজন ভারতীয় মেয়ে নিয়মিত শাড়ি পরেন? কয়েকটা বছর আগে অবধিও শাড়ি ছিল মা-কাকিমাদের নিত্যদিনের পোশাক। কিন্তু তাঁদের রোজকার জীবনেই বা শাড়ির তেমন উপস্থিতি আর কোথায়? কাজের জায়গায় সালোয়ার কামিজ বা জিনস-কুর্তিতেই স্বচ্ছন্দ আজকের ভারতীয় নারী। আর জেন ওয়াইয়ের অধিকাংশ মেয়ে তো শাড়ি পরতেই জানে না। তাই বলে কী বারো হাতের ম্যাজিক আর আকৃষ্ট করতে পারছে না আজকের ফেসবুক-হোয়্যাটস অ্যাপ প্রজন্মের মেয়েদের? প্রশ্নটা যে নিতান্ত অমূলক তা নয়। কিন্তু কলেজ-অফিসে শাড়ির ঝক্কি সামলাতে না চাওয়া এই প্রজন্মের মেয়েদের ফেসবুকের প্রোফাইল পিকচার বা কভার ফোটোতে বেশীরভাগ সময়েই দেখা যায় নিজেদের শাড়ি পরা ছবি।
এরকম হওয়ার কারণ কী? তাহলে নিত্যদিনের রুটিনে শাড়ি না থাকলেও কী তারা শাড়িকে ভুলে যায়নি? আসলে শাড়ি মানে উৎসব- সে সরস্বতী পুজোই হোক বা অষ্টমীর অঞ্জলি, বান্ধবীর বিয়েই হোক বা স্পেশ্যাল ডেটিং, শাড়ির আঁচল-পাড়ের নক্সায় মজে আছে ভারতীয় মেয়েরা। মা-ঠাকুমার কাছ থেকে পাওয়া বেনারসী, ঢাকাই-এর সঙ্গে সঙ্গে শাড়ির প্রতি এই আকর্ষণও বোধহয় উত্তরাধিকার সূত্রেই পেয়ে যায় মেয়েরা। সেইসব পুরনো শাড়ির ন্যাপথালিনের ভাঁজে ভাঁজে কত যে স্মৃতি। অনেক সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার বান্ধবী এই শাড়ি, বেস্ট ফ্রেন্ডের চেয়ে কম কিছু নয়। পুজোর সকালের তাঁতভাঙা গন্ধের সঙ্গে যেমন মিলে থাকে শিউলির গন্ধ, তেমনই অনেকদিন পরে আলমারী খুলে বিয়ের লাল বেনারসীর সোনালী নক্সাতে পাওয়া যায় জীবনের সবথেকে বিশেষ দিনটির অনুভব।saree-3
শাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এইসব নানারঙের স্মৃতিকে সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইটে ফিরিয়ে আনলেন অল্লি মাট্টান এবং অঞ্জু কদম নামে বেঙ্গালুরুর দুই মহিলা। ‘১০০ শাড়ি প্যাক্ট’ নামে এক ওয়েবসাইটের মাধ্যমে শাড়ি নিয়ে রীতিমত হইচই ফেলে দিলেন তাঁরা। কী এই ‘১০০ শাড়ি প্যাক্ট’? অঞ্জু এবং অল্লি নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে আবিষ্কার করলেন শাড়ি নিয়ে তাঁরাও আর পাঁচজন ভারতীয় মেয়ের মতোই খুব অবসেসড। নিজেদের প্রত্যেকটা শাড়ির পিছনেই একেকটা গল্প আছে তাঁদের। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের মেয়েদের জীবনেও কী শাড়ি এখনও এতটাই অপরিহার্য? তাদের কাছেও কী শাড়ি মানেই স্মৃতির ছোঁয়া? সোশাল নেটওয়ার্কনির্ভর এই সমাজে শাড়ির এই গল্প আরও বেশী মানুষের সঙ্গে শেয়ার করার জন্য প্রথমে তাঁরা ‘১০০ শাড়ি প্যাক্ট’ নামে একটি পেজ বানালেন ফেসবুকে। মহিলাদের উদ্দেশ্যে বলা হল এই বছরের মধ্যে একশোটা শাড়ি পরে ছবি আপলোড করতে, এবং প্রতিটা শাড়ির নেপথ্যে একটা করে গল্প বলতে। অভাবনীয় সাড়া পড়ে গেল! যে জেন ওয়াই শাড়ি থেকে শতহস্ত দূরে বলে মনে করা হত, দেখা গেল তারা নিত্যনতুন শাড়ি পরে ছবি আপলোড করছে, কখনও নিজের শাড়ি পড়া সেলফি, কখনও মায়ের সঙ্গে, বোনের সঙ্গে বা বান্ধবীদের সঙ্গে ঝলমলে সব শাড়ির ছবি আর সেইসঙ্গে গল্প।saree-2
কী সেইসব গল্প? কর্পোরেট চাকুরে লক্ষ্মী যেমন তেরো বছর বয়সে বাবার কাছ থেকে উপহার পাওয়া নিজের প্রথম শাড়িতে ছবি আপলোড করে জানিয়েছেন ‘মাকে দেখে শাড়ি পরতে খুব ইচ্ছে করত, মাঝেমাঝে খেলাচ্ছলে মায়ের শাড়ি পরে ঘোরাফেরা করতাম। একদিন বাবা দেখে ফেললেন, তার পরের দিনই আমার জন্য সাদা-নীল-সবুজ ডুরের তাঁত নিয়ে এলেন। সেই আমার প্রথম নিজের শাড়ি’। দেবিকার কাছে আবার তাঁর সোনালী জরির কমলা রঙের অরগাঞ্জা শাড়িটি ভীষণ স্পেশ্যাল, কারণ এটি তাঁর দিদিমার শাড়ি, সেই বিশেষ শাড়িতে নিজের ছবি দিয়ে তিনি লিখেছেন ‘দিদিমা এই শাড়ি মাকে জন্মদিনে উপহার দিয়েছিল, মায়ের কাছ থেকে আমি নিয়ে পরছি, আর আমার মেয়ে তো এটা নিজের জন্য আগাম বুক করে রেখেছে’। এভাবেই শাড়ি মেয়েদের চিনতে শেখায় তার সাংস্কৃতিক-পারিবারিক উত্তরাধিকার। এমনকী এই জেটযুগেও বারো হাতের এই ঐতিহ্যের বন্ধন প্রতিটা ভারতীয় মেয়েকেই কীভাবে বেঁধে রেখেছে ‘১০০ শাড়ি প্যাক্ট’-এর উদ্যোগ তাই দেখায় আমাদের।
তাই ওয়ার্ড্রোবের ক্যাজুয়াল-পশ্চিমী পোশাক না হয় তোলা থাক কাজের দিনের জন্য। বছরে বছরে যতই ফ্যাশনের পরিবর্তনে আসতে থাকুক রকমারি পোশাকের বাহার – শাড়ির আবেদন সরস্বতী পুজোর সকালে বাসন্তী শাড়ি পরে হাতেখড়ি দিতে আসা ছোট্ট মেয়েটির মতোই, চিরন্তন।

কিঙ্কিণী বন্দ্যোপাধ্যায়