পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছিলেন যাঁরা

1037

নারী স্বাধীনতা নিয়ে আজও চরম বিতর্ক। ৬৮ বছর পরও বাগ-বিতণ্ডার শেষ নেই। স্বাধীনতা পেতে আজও রীতিমত লড়াই করতে হয় মেয়েদের। কিন্তু, এটাও সত্যি যে লড়াই করে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল এমন নিদর্শন রয়েছে আমাদের দেশেই। নারী স্বাধীনতা নিয়ে তর্কের কোনও শেষ নেই। তাই এই তর্ক পিছনে ফেলে, ফিরে দেখা যাক সেইসব মহীয়সীদের জীবন। আজ চাকরি করতে যাওয়ার জন্য একটা মেয়েকে যতটা লড়াই করতে হয়, তার থেকে অনেক বেশি কঠিন ছিল তাঁদের পথ। তাঁদের লড়াই ছিল পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। তাই আজ তাঁদেরকেই উৎসর্গ করা হল আজকের ‘অনন্যা’।

ঝাঁসির রাণী লক্ষী বাই- lakshmiসাহসিকতায় অনন্যা হয়ে রয়েছেন তিনি ইতিহসের পাতায়। তিনিই প্রথম মহিলা স্বাধীনতা সংগ্রামী। ১৮৫৭ সালে বিদ্রোহের অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন তিনি। ঝাঁসি দখল করতে চেয়েছিল ব্রিটিশরা। কিন্তু, সাহস করে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন তিনি। গোয়ালিয়র ফোর্ট থেকে যুদ্ধ করেছিলেন তিনি। তাঁকে সাহসিনী তকমা দিতে বাধ্য হয়েছিলেন হিউজ রোজও। যুদ্ধক্ষেত্রেই প্রাণ হারান লক্ষী বাঈ।

 

 

সরিজিনী নাইডু-sarojinui ‘নাইটিঙ্গল অফ ইন্ডিয়া’ নামেও পরিচিত তিনি। ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম মহিলা প্রেসিডেন্ট তিনি। উত্তর প্রদেশের প্রথম গভর্নরও। মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে বহু সংগ্রামে লড়াই করেছেন তিনি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন বার্লিন কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং হিন্দু-জার্মান ষড়যন্ত্রের অন্যতম নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব। পরবর্তীকালে তিনি কমিউনিজমে আকৃষ্ট হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে পাড়ি দেন। মনে করা হয়, সেখানেই স্তালিনের নির্দেশে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। ১৯৩০-এ কয়েক মাস তিনি কারারুদ্ধ ছিলেন  থাকেন। ১৯৩১ সালের ৩১ জানুয়ারি, গান্ধীজির সঙ্গে সঙ্গে তাঁকেও মুক্তি দেওয়া হয়। সেই বছরেই পরে আবার তাঁদের গ্রেফতার করা হয়।

 

 

মাতঙ্গিনী হাজরা- matangini১৯০৫ সালে প্রত্যক্ষভাবে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন মাতঙ্গিনী হাজরা। মতাদর্শগতভাবে তিনি ছিলেন একজন গান্ধীবাদী।[২] ১৯৩২ সালে মাতঙ্গিনী আইন অমান্য আন্দোলনে যোগ দেন। সেই সময়ে তিনি লবণ আইন অমান্য করে গ্রেফতারবরণ করেছিলেন। অল্পকাল পরেই অবশ্য তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কর মকুবের দাবিতে প্রতিবাদ চালিয়ে গেলে আবার তাঁকে কারারুদ্ধ করা হয়। এই সময় তিনি বহরমপুরের কারাগারে ছয় মাস বন্দী ছিলেন। ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় ফৌজদারি আদালত ভবনের উত্তর দিক থেকে মাতঙ্গিনী একটি মিছিলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। পুলিশ গুলি চালালে তিনি অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবকদের পিছনে রেখে নিজেই এগিয়ে যান। পুলিশ তিনবার তাঁকে গুলি করে। গুলি লাগে তাঁর কপালে ও দুই হাতে। তবুও তিনি এগিয়ে যেতে থাকেন। এরপরেও বারংবার তাঁর উপর গুলিবর্ষণ করা হয়। কংগ্রেসের পতাকাটি মুঠোর মধ্যে শক্ত করে উঁচিয়ে ধরে বন্দেমাতরম ধ্বনি উচ্চারণ করতে করতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

 

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার- সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের পরিকল্পনা করতে গিয়ে বোমা বানানোর খোল আনার দায়িত্ব দেওয়া হয় প্রীতির চক্রকে। এই খোল পরে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে কাজে লাগানো হয়। ১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের নেতৃত্বে ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণের সিদ্ধান্তb-1 গ্রহণ করা হয়। তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে বিপ্লবীরা ক্লাব আক্রমণ শুরু করে। পূর্বদিকের গেট দিয়ে ওয়েবলি রিভলবার এবং বোমা নিয়ে আক্রমণের দায়িত্বে ছিলেন প্রীতিলতা, শান্তি চক্রবর্তী আর কালীকিংকর দে। প্রীতিলতা হুইসেল বাজিয়ে আক্রমণ শুরুর নির্দেশ দেওয়ার পরেই ঘন ঘন গুলি আর বোমার আঘাতে পুরো ক্লাব কেঁপে কেঁপে উঠছিল। পাল্টা আক্রমণ আসে। গুলি এসে লাগে তাঁর গায়ে। আক্রমণ শেষে প্রীতিলতা পটাসিয়াম সায়ানাইড মুখে পুরে দেন। ময়না তদন্তে জানা যায় গুলির আঘাত তার মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট ছিল না। তার মৃত্যু হয়েছে পটাসিয়াম সায়ানাইড এর বিষক্রিয়ায়।