আমাদের গেছে যেদিন একবারেই কি গেছে…

898

টিউশন ক্লাস,প্রেমপত্র, লাল গোলাপ,আড় চোখে তাকানো। বন্ধুতা, মান-অভিমান, প্রথম ছোঁওয়া,রাত জেগে কথা…  হারানো সময়, হারানো মানুষ। স্মৃতির বায়োস্কোপে চোখ রেখে চলে যাই টাইম মেশিনে৷ ফের প্রাক্তনের হাত ছুঁলাম।

স্কুলপথেই দেখা৷ মাঝেমাঝে বাড়ির ল্যান্ড ফোনটা বেজে ওঠা। এতো ছিল শুরু। ডায়েরির পাতায় শুকিয়ে রাখা ভালবাসার গোলাপ।

লিখলেন- মানসী সাহা
লিখলেন- মানসী সাহা

টিউশন ফেরার পথে আলো-আঁধারি গলিতে লেগে থাকা প্রথম প্রেমের অস্তরাগ। পার্কের বেঞ্চে পা ঝুলিয়ে হাতে হাত রেখে আটকে পরা এক প্রেমকাহিনির রূপকথা। এই রূপকথাতেই ছিল দু’টি মনের বসবাস। অথবা টুকরো টুকরো কিছু স্বপ্নের।

যেখানে হাতের মুঠোয় চিঠি আর গায়ে গা লাগানো আর্চিজের লাভবার্ডের মতো মনের সঙ্গে মন থাকত জড়িয়ে। যেখানে বাড়ির ভয়ে রোজ দেখা না হলেও, বারান্দায় দাঁড়ালেই দেখা হয় দু’চোখের। সেখানে বড়দের চোখরাঙানি সাইকেলের বেলের আওয়াজে ফেকাসে হয়ে যায়।

চাওয়া-পাওয়ার উর্ধ্বে আরও কাছাকাছি আসে দু’টি হৃদয়। এমন প্রেমকাহিনি আমাদের সবার মনের মনিকোঠায় সযত্নে রাখা আছে। যা আমাদের একান্ত নিজস্ব। আজও সযত্নে লালন করে যাকে ‘প্রাক্তন’ বলে ডাকি।

সে ছিল আমার কল্পনা
কবির কল্পনা নয়। এ কল্পনা আমার-আপনার। ধরা যাক এই প্রেমের গল্পে নায়িকার নাম সুচিস্মিতা। বৃষ্টিভেজা একলা মেঘলা দিনে এক এক করে যে, খুঁজে পাচ্ছে সময়ের ফাঁকে গলে যাওয়া চেনা আধুলি। তমাল দা’র টিউশন ব্যাচের চুপচাপ সেই ছেলেটা, সেই লাল রঙেন গিয়ার দেওয়া সাইকেল, সদ্য রেখা ওঠা গোফেঁর নীচে মুচকি হাসি৷ কল্পনায় আঁকা পুরুষটির সঙ্গে মিলে যাচ্ছে হুবহু। সেই ছেলেটা স্কুলের অনুষ্ঠানে গিটার বাজিয়ে গান করে ঘুরে ফেরে মেয়েদের মুখে মুখে। গোমরা মুখে জমে ওঠে অভিমান মনের মধ্যে। হাত ধরে আচমকাই টেনে ধরে বলে, “তুই ছুঁড়বি থালা-বাটি, আমি ভাঙব কাঁচের বাসন। পাগলী তোমার সঙ্গে দিবানিদ্রা কাটাব জীবন…..” তাঁর চাওনি চোখে ঝিলমিল লাগিয়ে দেয়। স্বপনে মানুষের ঘোর কাটিয়ে সে তখন মনের মানুষ।

চোখের দেখা, মনের কথা সেকি ভোলা যায়
পুরনো প্রেম গায়ে মাখতে মাখতে, সময়ের উল্টো সিঁড়ি বেয়ে কানে আসে চেনা গলার স্বর। আজ হলুদ চুরিদারটা পরে আসিস। আর হ্যাঁ, চোখে কাজল দিতে ভুলিস না। তোকে বেশ লাগে কিন্তু। নিজের অজান্তে ঠোঁট আঁকে হালকা হাসির রেখা। চোখ চলে যায় আয়নায়, তাতে ভেসে ওঠে ‘বনশ্রী’ সিনেমা হলের টিকিট কাউন্টারের মস্ত লাইন। কত কাঠখড় পুড়িয়ে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম। সব প্ল্যানে জল! লাইনে বুড়ো কাকু আর কাকিমা। ভাগ্যিস দেখেনি। সে যাত্রায় রক্ষে। কত গালাগালি দিয়েছিলি কাকু-কাকিমাকে। পাগল একটা। দূর্গাপুজোয় পকেটমানি বাঁচিয়ে কালো শাড়িটা কিনে দিয়েছিল। বলেছিল, অষ্টমীর দিন এটা পরিস৷ একসঙ্গে ঠাকুর দেখতে যাব। হিরে-জহরতের মতো আগলে হাত ধরে সারারাত এক প্যান্ডেল থেকে আরেক প্যান্ডেল। নতুন জুতোয় পায়ে ফোসকা পরা দেখে বলেছিল চাকরি পেয়ে বাইক কিনব। তখন পায়ে হেঁটে আর ঠাকুর দেখতে হবে না। আচমকাই ‘পা’ কেঁপে ওঠে। পাল্টে যাচ্ছিস তুই! শরীররে যে, গন্ধ একসময় প্রাণ ভরে নিতিস তা ধীরে ধীরে ঘামের দূরগন্ধে আখ্যা দিলি। পড়াশোনার নাকি ভীষণ চাপ, দেখা করার সময় কোথায়। আব্দার গুলোয় এখন আর নেই। পছন্দের হলুদ জামাটা পরলেও নজর করে না। চোখের জলে ঝাপসা হয়ে আসে চারিদিকটা। আর সেই ঝাপসা আলোয় ভাঙে বিশ্বাস। তোর চোখে অন্য স্বপ্ন। আমি হয়ে যাই তখন ‘প্রাক্তন’।

তোমার দেশে আমার ভিসা নেই:                  হাজারের মাঝে খুঁজে ফিরতি এখন চোখাচোখি হওয়ার ভয়ে চরম সাবধানীর অবলম্বন। তোর দেশের ভিসা শেষ হয়ে গিয়েছে, অন্য দেশে আমার এখন বাস। মনের দরজায় খিল দিয়েছি সেই কবে। কিন্তু পার্কের সেই বেঞ্চ, পাড়ার রাস্তা, ভোলাদা’র ফুচকার দোকান, হলুদ রং মাঝেমাঝে দরজার কড়া নাড়া দিয়ে যায়। তবে সময় কোথায় নষ্ঠ করার। কাল সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে হবে। বাবুকে স্কুলের জন্য রেডি করাও, সকালের ব্রেকফাস্ট বানাও , ওর টিফিন প্যাক কর৷ তারপর অফিসের জন্য তৈরি হতে হবে। বেড সুইচটা অফ করে ঘড়ির টিক টিক আওয়াজের আড়ালে মৃদু দীর্ঘশ্বাস, ঠিক মতো খায় সকালবেলা? টিফিনবাক্স সঙ্গে নেয় কি?

আসলে এখন মনে হয়, ‘‘উফফ…কতদিন তোমাকে দেখিনি, দেখতেও চাই না সেকথা মিথ্যা নয়৷ আসলে জীবন বলে সত্যিই কিছু নেই৷ জীবন জীবিত থাকার অভিনয়৷ কেন করলে এরকম? বল? কেন করলে এরকম?’’