আর্থিক সংকটেও সায়নীর ফেলপ্স হওয়ার স্বপ্ন অটুট

562

প্রায়শই সর্দি-কাশি লেগে থাকত বলে ডাক্তারের নির্দেশে সাঁতারে ভরতি হতে হয়েছিল তাঁকে৷ সেই পাঁচ বছর বয়সে বাবার হাত ধরে পাড়ার সুইমিং পুলে যাওয়া শুরু৷ কিন্তু জল দেখলেই ভয়ে সিঁটিয়ে যেত সেদিনের ছোট্ট সায়নী ৷

ট্রেনাররাই ধরে বেঁধে জলে নামাত তাঁকে৷ কিন্তু তখন কি সায়নী জানতেন একদিন জলযোদ্ধা হিসেবেই গোটা দেশ তাঁকে চিনবে? সাউথ এশিয়ান গেমসে সোনাজয়ী সায়নী ঘোষই এবার আমাদের অনন্যা৷ সপ্তদশী এই সাঁতারুর লড়াইয়ের গল্প শুনলেন দেবযানী সরকার৷

বালি স্টেশনের পাশে দোতলা বাড়ির ছোট্ট একটা ঘরে বাবা-মা-দাদার সঙ্গে থাকে সায়নী৷ বালির শিক্ষানিকেতন গার্লস স্কুলের দশম শ্রেনীর ছাত্রী সে৷ এবছর মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসার কথা থাকলেও সাউথ এশিয়ান গেমসে অংশগ্রহণ করার জন্য আর পরীক্ষা দেওয়া হয়নি তাঁর৷ তবে সে দুঃখ ভুলিয়ে দিয়েছে সাউথ এশিয়ান গেমসে তাঁর সাফল্য৷ প্রথম স্থান পেয়ে সোনার মেডেল নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন সে৷

সায়নীর বয়স এখন ১৭৷ এর মধ্যেই স্কুল মিট,সাব জুনিয়র, জুনিয়র ও সিনিয়র জাতীয় মিট মিলিয়ে চারটি সোনা ও পাঁচটি রুপোর পদক তাঁর SAGবাড়িতে শোভা পাচ্ছে৷ ব্রোঞ্জ জিতেছেন গোটা সাতেক৷ এই বয়সেই সাফল্যের চূড়া ছুঁলেও সায়নীর জীবনে সাঁতরে পার হওয়া পথ ততটা মসৃণ নয়৷ পারিবারিক স্বচ্ছলতার অভাবই তাঁকে বারবার বেগ দিচ্ছে৷ এককথায় স্রোতের প্রতিকূলেই লড়ে চলেছেন তিনি৷

সায়নীর পরিবারে রোজগেরে সদস্য বলতে একমাত্র তার বাবা শ্যামল ঘোষ৷ বালি স্টেশনের ধারে ছোট্ট একটা রোলের দোকান চালিয়ে মেরে কেটে তাঁর আয় মাসে তিন-চার হাজার টাকা৷ সায়নী বলেই ফেললেন, “এই টাকা দিয়ে চারজনের পেট চালাতে বাবাকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়৷ এরপর প্রপার ডায়েট চার্ট মেনে খাওয়াদাওয়া সম্ভব নয়৷ দুধ খেলে কর্নফ্লেক্স খাওয়া হয় না৷ চিজ, প্রোটিন পাউডার, হেল্থ ড্রিঙ্কের অনেক দাম৷ সেসবতো স্বপ্ন৷ এরমধ্যেও বাবা চেষ্টা করেন নিয়মিত আমাকে ডিমটা খাওয়াতে৷” আক্ষেপের সুরে সায়নী বললেন, “আমার জন্য দাদাকেও ঠিকমতো সফটওয়ার ট্রেনিংয়ের কোর্সটা করাতে পারল না বাবা৷”

এই কথাগুলো শোনার পর কে বলবে এই মেয়ের বয়স মাত্র ১৭? দারিদ্রতার সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুঝে সায়নী এখন যথেষ্ট ম্যাচিওরড৷

সাঁতার কাটার সময় জলে চোখ জ্বালা করলেও বাবাকে সে একবারের জন্যেও বলে না অন্যদের মতো দামী ওয়াটার গ্লাস কিনে দিতে কিংবা একটু দামী কস্টিউম কিনে দেওয়ার জন্য৷ নিজের যা আছে তা দিয়েই আরও আরও রেকর্ড গড়তে চান তিনি৷ সমস্ত প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে এই বঙ্গতরুণী চান, তাঁর স্বপ্নের নায়ক মার্কিন সাঁতারু মাইকেল ফ্লেপসকে ছুঁতে৷

রাজ্য সরকার ক্রীড়াপ্রেমীদের জন্য যথেষ্ট আন্তরিক হলেও তাঁর জন্য এগিয়ে আসার কেউ নেই৷ আক্ষেপের সুরে বললেন সায়নী৷ জানালেন, বহুবার অনেক দরজায় কড়া নেড়েও কোনও লাভ হয়নি৷ শুকনো হাতেই ফিরতে হয়েছে তাঁকে৷ কিন্তু তাঁর অদম্য জেদ কোনকিছুর কাছেই মাথা নোয়ায়নি৷

যদিও ইস্টবেঙ্গল ক্লাব সায়নীকে এক লক্ষ টাকা দিয়েছে৷ লাল-হলুদের অফিসিয়াল ফ্যান ক্লাবের উদ্ধোধনের দিন সায়নীর হাতে ক্লাবের পক্ষ থেকে এই টাকা তুলে দেওয়া হয়েছিল৷ কর্তারা মঞ্চে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, আগামী দিনে সায়নীর সাঁতার সংক্রান্ত যাবতীয় খরচ ক্লাবই যোগাবে৷

অনেকবার ‘কোনি’ সিনেমাটা দেখেছে সে৷  যখনই কোনও প্রতিকূলতার মধ্যে পড়ে, তখনই সিনেমার কথাটা একবার ভেবে নেয় সায়নী৷ নিজেই জানালেন সেকথা৷ সায়নী কথায়, কোনি তাঁকে মোটিভেট করে৷ সারাদিনে এখন ছ’ঘন্টা সাঁতার কাটেন সায়নী৷ ভবিষ্যতে বড় সাঁতারু হওয়াই সায়নীর লক্ষ্য৷ নিজের তো বটেই, সেইসঙ্গে যাঁদের অবদান তাঁর জীবনে রয়েছে সেই বাবা-মা-দাদা আর কোচ সুরজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের স্বপ্নকে পূরণ করতে সায়নী বদ্ধপরিকর৷ সেইসঙ্গে চান নিজের হাতে বাংলায় আরও অনেক সায়নীকে গড়ে তুলতে৷ আপাতত সায়নীর লক্ষ্য বেঙ্গালুরুতে সিনিয়র মিট৷