প্যাডেলে ঘোরে জীবন, রিক্সাওয়ালি মিঠু একাই একশো

5208

সমাজ মনে করে এখনও এমন কিছু পেশা আছে যে পেশায় ছেলেদেরই একচেটিয়া আধিপত্য৷ মেয়েরা সেই কাজ করলেই চারপাশে গেল গেল রব৷ রিক্সা চালিয়ে ভাতের জোগাড় করতে গিয়ে এর জন্য মিঠু পন্ডিতকে সহ্য করতে হচ্ছে হাজার ঝড় ঝাপটা৷ কিন্তু এসবকে থোড়াই কেয়ার করেন তিনি৷ জীবন যুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে বছর পঁচিশের এই মেয়ে৷ মিঠুর সংগ্রামী জীবনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরলেন দেবযানী সরকার৷
কিছু গল্পের নায়িকা আছে যাঁদের জীবনে বেশিরভাগটা জুড়েই ট্র্যাজেডি৷ বেহালার পরাশরতলার মিঠুর জীবনও অনেকটা তাই৷ যে বয়সে পড়াশোনা করে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে ছেলে-মেয়েরা সেই বয়সেই রূঢ় জীবনে দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করছে এই যুবতী৷

আরও অফবিট পড়ুন: অগ্নি-৩, ৪, ৫! ভারতের সাফল্যের পিছনে রয়েছেন এই ‘মিসাইল কন্যা’

চোদ্দ বছর বয়সে উত্তরপ্রদেশে বিয়ে হয়েছিল মিঠুর৷ স্বামীর সঙ্গে সংসার করা হয়ে ওঠেনি তার৷ স্বামী পরিত্যক্তা হয়ে বাপের বাড়ি মেদিনীপুরে ফেরে মিঠু৷ তখন তার গর্ভে চার মাসের সন্তান৷ ছেলের জন্মের পর কলকাতা এসে লোকের বাড়িতে কাজ নিয়েছিল সে৷

কলকাতায় থাকতে খাকতে আরও একজনের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পরে মিঠু৷ বিয়েও হয়৷ কিন্তু বিয়ের কয়েক মাস পর মিঠু জানতে পারেন তাঁর দ্বিতীয় স্বামীর আগের এক স্ত্রী আছে৷ যেন আকাশ ভেঙে পরে মিঠুর মাথায়৷ ভাবে, আবার একটা ভুল৷ কারণ তখন তার গর্ভে একটু একটু করে বাড়ছে আরও এক সন্তান৷

মিঠুর কথায়, আমার এই বিয়ে বাড়িতে মেনে নেয়নি৷ তাই বাপের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার কোনও রাস্তা ছিল না৷ আমার দ্বিতীয় স্বামী খুব নেশা করত৷ সেরকম কাজও করতে পারত না৷ মাঝেমধ্যে রিক্সা চালাত৷ সংসার চালাতে আমি লোকের বাড়ি কাজ করতাম, সবজি বিক্রি করতাম কিন্তু স্বামী-স্ত্রী দুটো বাচ্চার পেট চালাতে এতে কিছুই হত না৷

আরও অফবিট পড়ুন: জন্মদিনে ‘মৃত’ বাবার উপহার পান মেয়ে!

যার জন্য এত কিছু, সেই মিঠুর দ্বিতীয় স্বামীও একদিন তাকে ছেড়ে চলে যায়৷ দুই সন্তানকে নিয়ে মিঠু তখন একদম একা৷ কি করবে ভেবে না পেয়ে রিক্সা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় মিঠু৷ প্রথমে ভাড়া রিক্সা চালানো শুরু করে৷ একবছর হল নিজে রিক্সা কিনেছে সে৷

কিন্তু ওই যে এখনও মেয়েদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণের রাশ নিজেদের হাতে রাখতে চায় পুরুষতান্ত্রিক সমাজ৷ মেয়েরা কি করবে কি করবে না ঠিক করে দিতে চায় তারা৷ আর না শুনলেই চোখ রাঙানি৷ মিঠুর ক্ষেত্রেও তাই হচ্ছে৷

আরও অফবিট পড়ুন: মহিলাদের চেয়ে সত্যিই কি অনেক বেশি মিথ্যা বলেন পুরুষেরা?

রিক্সাওয়ালি মিঠুর অভিযোগ, রিক্সা স্ট্যান্ডে তাকে দাঁড়াতে দেওয়া হয়না৷ প্যাসেঞ্জারও তুলতে দেওয়া হয়না৷ তার কথায়, অন্য রিক্সা চালকরা আমাকে রীতিমত হুমকি দেয়৷ বলে মেয়েদের অনেক কাজ আছে সেসব কর৷ রিক্সা চালাবি না৷ অনেকবার আমার রিক্সার ক্ষতি করেছে ওরা৷ আসলে রিক্সা চালিয়ে আমার যে আয় তাতে একশো দিনের কাজ বা লোকের বাড়িতে বাসন মেজে এই টাকা আয় হয় না৷

তবে পাড়ার পুরনো অনেক লোকই মিঠুকে সমর্থন করে৷ এক স্থানীয় বাসিন্দার কথায়, ওর পাশে দাঁড়াবো নাই বা কেন? ও তো খেটে খাচ্ছে৷ চুরি-ডাকাতি তো করছে না৷ মেয়েরা তো এখন সবরকম কাজ করছে৷ কোনও কাজই খাটো নয়৷ আর ওর এই পরিশ্রমকে আমাদের সম্মান জানানো উচিত৷

আরও অফবিট পড়ুন: বিশ্বের সবথেকে ‘সেক্সি’ নার্সকে দেখতে মিথ্যা অজুহাতে হাজির রোগীরা

তবে মিঠুও এত সহজে ময়দান ছাড়ার পাত্রী নয়৷ সে জানিয়েছে, ওরা আমার যা ক্ষতি করে করুক আমি রিক্সা চালানো বন্ধ করব না৷ ছেলে-মেয়েকে মানুষ করতে আমি সবার সঙ্গে লড়তে রাজি৷ অন্যায় যখন করছি না তখন আমার কোনও ভয় নেই৷

সিঁথিতে চওড়া সিঁদুর, কপালে টিপ, দু-হাতে শাখা-পলা পরেই দু-বেলা রিক্সায় প্যাডেল করছে মিঠু৷ দুই সন্তানকে পড়াশোনা শিখিয়ে মানুষ করাই এখন তার লক্ষ্য৷

আরও অফবিট পড়ুন: এই ৭ ঘরোয়া উপায়ে বাড়ি থেকে বিদেয় করুন আরশোলা