‘মেয়েদের ক্ষেত্রে একটা অদৃশ্য চাপ থাকে’

367

যিনি রাঁধে তিনি চুলও বাঁধেন৷ যশোধরা রায়চৌধুরীর ক্ষেত্রে অক্ষরে অক্ষরে মেলে প্রবাদ বাক্যটি৷ কেন্দ্রীয় সরকারের অডিট বিভাগের এই উচ্চপদস্থ অফিসার কবিতা-গদ্য দুই-ই সমানতালে লেখেন৷ সাহিত্যজগতের অতি পরিচিত মুখ যশোধরা রায়চৌধুরী এখন চাকরিসূত্রে ওডিশায় থাকেন৷ ফোনে তাঁর সঙ্গে কথা বললেন দেবযানী সরকার৷

কলকাতা 24×7: ওডিশাতে কী এখন সপরিবারেই থাকেন?
যশোধরা: নাহ৷ ছ’মাস হল কলকাতা থেকে আমি এখানে এসেছি৷ মেয়ে, হাজব্যান্ড সবাই কলকাতাতেই আছে৷ এর আগে আসামে যখন ছিলাম তখন সবাই একসঙ্গে থাকতাম৷ এখন মেয়ের পড়াশোনার জন্য ও আর আমার সঙ্গে আসতে পারে না৷
কলকাতা 24×7: পরিবারকে মিস করেন?
যশোধরা: অবশ্যই মিস করি৷ চাকরি করলেও মাথার মধ্যে তো পরিবারের জন্য ভাবনাটা থাকেই৷ তবে যেহেতু আমি লেখালিখি করি, তাই লিখতে গিয়ে আমার নিঃসঙ্গতা কেটে যায়৷
কলকাতা 24×7: ছেলেরা চাকরিসূত্রে অনেক সময় সংসার ছেড়ে বাইরে থাকেন…সমাজ পুরুষদের ক্ষেত্রে বিষয়টা খুব সহজভাবে নিলেও মেয়েদের ক্ষেত্রে কী সেভাবে নেয়? আপনাকেও তো কাজের জন্য এ রাজ্য-সে রাজ্য ঘুরতে হয়৷ কোনওদিন কোনও সমস্যা হয়নি?
যশোধরা: প্রথম থেকেই ব্যাল্যান্স করতে হয়েছে৷ আগে অফিসে গিয়েও তেল-নুনের হিসেব রাখতে হত৷ এখন অবশ্য করতে হয় না৷ আমি যখন রাঁচিতে ছিলাম তখন আমার মেয়ে খুব ছোট৷ শাশুড়ি মা সেইসময় মেয়েকে নিয়ে আমার সঙ্গে ছিলেন৷ যখন আসামে ছিলাম তখন আমার হাজব্যান্ড সেখানে গিয়ে ছিলেন৷ আমার পরিবার খুব সাপোর্টিভ ছিল। তবুও আমাকে সবকিছু করার পর শুনতে হয়েছে– ‘তুমি তো সবসময় বাইরে থাকো’৷ আসলে মেয়েদের ক্ষেত্রে একটা অদৃশ্য চাপ থাকে৷
একবার আমার শাশুড়ি প্রায় বলেই ফেলেছিলেন বউমা অফিসার না হয়ে কেরানি হলেই ভাল হত! তাহলে চারটের মধ্যে বাড়ি চলে আসত৷ তবে চাকরি বা লেখালিখির সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করার কথা ভাবিনি৷ দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করে গিয়েছি৷

মেয়ের সঙ্গে
মেয়ের সঙ্গে

কলকাতা 24×7: পেশা, নেশা এবং সংসার এই তিনটে একসঙ্গে কিভাবে সামলান?
যশোধরা: নেশাটা আমাকে বাঁচিয়ে রাখে৷ ওটাই আমার আসল জায়গা৷ তাই ওটাকে সচেতন ভাবে বাঁচিয়ে রাখি৷

কলকাতা 24×7: সাহিত্যের পরিমণ্ডলে বেড়ে উঠেছেন…বাড়ির সবাইকে দেখেই কি সাহিত্য জগতে আসার ইচ্ছা হয়েছে?
যশোধরা: বাবা মা, দাদু, দিদা, কাকা পিসি সবাই কোনও না কোনও ভাবে লিখেছেন, ছেপেছেন৷ আমার মধ্যেও লেখালিখির তাগিদ ছিল৷ ছোটবেলায়, যখন আমার কবিতা লেখার শুরু, তখন সত্যিই বুঝতাম না এই সাংস্কৃতিক পরিবেশ ইত্যাদির যে আবার কোনও দাবি থাকতে পারে! চাপ ছিল মায়ের, পড়াশুনো ভাল করে করার। সেটাতে ফাঁকি দিয়েই তো কবিতা লেখা শুরু!
কলকাতা 24×7: বাংলা সাহিত্যের অনেক পুরস্কার আপনি পেয়ে গিয়েছেন? দায়িত্ব বেড়ে গিয়েছে বলে মনে হয়?
যশোধরা: যে মুহূর্তে একটি পুরস্কার আসে, সেই মুহূর্তে খুব বিভ্রান্ত লাগে। নিজেকে বার বার প্রশ্ন করতে হয়, আমি কী এমন? কেন পেলাম এই পুরস্কার? পেয়েছি খুব কম বয়সেই ‘কৃত্তিবাস পুরস্কার’। মাথাটা সত্যি তখন বিজবিজ করেছিল। মনে হয়েছিল মহা-দায়িত্ব!
পরবর্তী কালে বিভ্রান্তি কমেছে। আমরা চিরকাল শুনে আসছি, পুরস্কার সবসময় যোগ্যতা দিয়ে হয় না। সেখানেও তো কত কুমন্তব্য, রটনা। নানাভাবে বলা হয়, দাদা মামা কাকা ধরলেই সব পাওয়া যায়। আবারও বলছি, আমার নিজের ক্ষেত্রে এই বিষয়টা কখনও অনুভব করিনি। লেখালিখির জন্য পুরস্কার বা চাকরিতে পদোন্নতি সবই আমার নিজের যোগ্যতায় হয়েছে৷

Yasodhara

কলকাতা 24×7: আপনার স্বামীও সাহিত্য জগতেরই লোক এবং একই সঙ্গে অনুবাদক। লেখালিখির বিষয়ে কখনও তাঁর পরামর্শ নেন নাকি প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে?
যশোধরা: তৃণাঞ্জন খুবই পড়াশুনোর লোক। কিন্তু ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী নয় একেবারেই। ও ফরাসি ভাষাটাকে হাতের তালুর মতো জানে। ওর একেবারে অহংকার নেই, যতটা ও জানে তার এক সহস্রাংশও ফাটায় না। আবার অন্যদিক থেকে ও খুবই অহংকারী। কারণ সবার সঙ্গে সব বিষয়ে আলোচনা করার কথাও ও মনে করে বাতুলতা। স্বল্পভাষী। কাজেই ওর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ওই দুটোর কোনওটাই না। বরং ও আমার খুব ভাল বন্ধু। আর ওর মতো ও বলবেই না। আমার ধারণা আমরা দুই স্বাধীন প্রাণী। তবে কোথাও আমাদের পারস্পরিক নির্ভরতা আছে।
কলকাতা 24×7: আপনার লেখালেখির কথা তো অনেক জানলাম৷ কিন্তু আপনার অন্য একটা দিকও খুব উজ্বল৷ইন্ডিয়ান অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস সার্ভিসে আপনি প্রিন্সিপ্যাল অ্যাকাউন্টস জেনারেল৷ এবার বলুন বস হিসেবে আপনি কেমন?
যশোধরা: আমি বস হিসেবে খুব ফ্রেন্ডলি৷ কারোর উপর বসিং করি না৷ যতটা পারি হাসিমুখে কাজ করিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি৷
কলকাতা 24×7: ভবিষ্যতের কিছু পরিকল্পনা রয়েছে?
যশোধরা: গদ্য লেখাটা খুব পরিশ্রমের৷ আট-নয় বছর এখনও আমার আর চাকরি আছে৷ অবসর নেওয়ার পর সেই কাজটাই করার খুব ইচ্ছে৷