অসাধ্য সাধন করে তেলুগু মেয়ে ষোলো আনা বাঙালি বধূ

31168

একই আধারের মধ্যে অসামান্যা গুণ, হাজারো বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের মধ্যে দিয়ে চলার পথে তিনি ছাপ রেখেছেন৷ আদ্যান্ত তেলুগু মেয়ে ‘মির‍্যাকল’ ঘটিয়ে এখন ষোলো আনা বাঙালি বধূ! তিনি ওয়াই এনামাদ্রি সুনীতা৷ বিধাননগর মেলায় তাঁকে আবিষ্কার করলেন প্রতিনিধি দেবযানী সরকার৷ শুনলেন তাঁর অসাধ্য সাধনের গল্প…

আদ্যান্ত তেলুগু৷ অথচ তাঁকে অনায়াসে বাংলার ‘বধূ নম্বর ওয়ান’ বলে যেতেই পারে! –এটা খবর নয়৷
একই আধারের মধ্যে অসামান্যা গুণ, হাজারো বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের মধ্যে দিয়ে চলার পথে যিনি ছাপ রেখে যান, প্রমাণ করেন- ‘চেষ্টা থাকলে অসাধ্য সাধন করা যায়’- খবর তো সেটাই৷

ইনি ওয়াই এনামাদ্রি সুনীতা, এখন সুনীতা দাস৷ সাবলম্বী হওয়ার তাগিদ থেকে মাত্র ৫০০টাকার পুঁজিকে সম্বল করে পথ চলা শুরু করেছিলেন৷ হাতযশ, কাজের প্রতি নিষ্ঠা, ধারাবাহিকতা ও টিম ম্যানেজমেন্টের দৌলতে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর পেশায় তিনি এখন মহীরূহ, তিন তিনটি স্বনির্ভর গোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান৷ যেখান থেকে শতাধিক মহিলা মাথা উঁচু করে নিজেদের ভরনপোষণ করতে সক্ষম৷ সুনীতার হাতে গড়া পিঠে-পুলির স্বাদে তৃপ্ত হয়ে পুরষ্কৃত করেছেন স্বয়ং দেশের প্রধানমন্ত্রী৷ এহেন ‘পাকা’ রাঁধুনীর ‘লাইভ পিঠে’র কাউন্টারে বছরভর পিঠেপ্রেমীদের ভিড় উপছে পড়বে না, তা কি কখনও হয়! হাত-যশের দৌলতে তাঁর নিত্য কেনাবেচার অঙ্কটা বেশ ইর্ষনীয়, গড়ে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা!

Sunita1

শুধু খুন্তি নাড়াতেই আটকে রাখেননি নিজেকে, আত্মরক্ষার্থে ছোট থেকেই সুনীতা পারদর্শী ক্যারাটেতেও৷ এলাকার অন্য মহিলাদেরও ক্যারাটের তালিম দিয়েছেন তিনি৷ অসম সাহসিকতায় পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই মহিলা নারী পাচারকারীদের কবল থেকে মুক্ত করে এনেছেন মছলন্দপুরের একটি মেয়েকে৷ তাঁর সেই উদ্যোগ বাহবা কুড়িয়েছে পুলিশ প্রশাসনের দুঁদে কর্তাদের৷ সুনীতার ধারাবাহিক লড়াই- আন্দোলনের জেরে প্রশাসনে বাধ্য হয়েছে এলাকার মদ ও জুয়ার ঠেক গুঁড়িয়ে দিতে৷

বিয়ের পর যখন স্বামীর সঙ্গে বাংলার মাটিতে পা রাখলেন তখন বাংলা উচ্চারণ তো দূরে থাক, ‘অ’, ‘আ’, ‘ক’, ‘খ’- কাকে বলে জানতেন না৷ অনভ্যস্ত ছিলেন বাংলা ‘কালচারে’র সঙ্গে৷ কিন্তু চেষ্টা থাকলে যে ‘মিরাক্যাল’ ঘটানো যায়- আদ্যান্ত বাংলা শিখে, ষোলো আনা বাঙালিয়ানা রপ্ত করে সুনীতাদেবী এখন ‘ন্যাশনাল রুরাল লাইভলি মিশনে’র আনন্দধারা প্রকল্পে বাংলা অনুবাদের শিক্ষক!

sunita5

তিলোত্তমা কলকাতা হোক কিংবা মফঃস্বলের জেলা -বাংলার যে কোনও বড় মেলার প্রধান আকর্ষণ তিনি৷ অন্য দোকানীরা যখন খদ্দেরের জন্য হা-পিত্যেশ করেন, তখন মেলার চৌকাঠে পা রেখেই খাদ্যরসিকরা খোঁজ করেন সুনীতাদেবীর ‘লাইভ’ পিঠের কাউন্টারের৷ কাউন্টারের নাম ‘লাইভ’ পিঠে কেন? সলজ্জ জবাব আসে, ‘‘হাতে নাতে টাটকা পিঠে তৈরি করি যে!’’

কৈশোরেই ক্যারাটের মাঠে দাগ রেখেছিলেন সুনীতা৷ গোদাবরীর ঘুন্টুর দক্ষিণী কন্যা বেঙ্গালুরুতে একটি ক্যারাটে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন৷ সেটা ’৮০ সাল৷ সেখানেই আলাপ হাবড়ার গৌতম দাসের সঙ্গে৷ আলাপ থেকে বন্ধুত্ব, মন দেওয়া-নেওয়া৷ মনের টানেই সাত পাকে বাঁধা পড়ে স্বামী গৌতমের হাত ধরে দক্ষিণী রাজ্য থেকে বাংলার মাটিতে পা রাখা৷

সংসারপাতার গোড়ার দিনগুলো অবশ্য খুব একটা সুখকর ছিল না সুনীতার জন্য৷ হতে পারে স্বামী কখনও তাঁকে অ-ভালবাসা করেননি৷ কিন্তু দক্ষিণী পরিবেশে বেড়ে ওঠা তেলুগু মেয়েকে বাংলার বধূ হিসেবে দেখে আত্মীয় সজ্জন থেকে প্রতিবেশী, হাজারো টিপ্পনি কেটেছেন তাঁরা৷ কথায় কথায় ফিরে যান প্রায় সাড়ে তিন দশক আগের স্মৃতিতে৷ বলতে থাকেন, ‘‘বাংলা বুঝতাম না৷ তাই প্রথমে যখন এখানে আসি, পাড়ার সবাই আমাকে নিয়ে খুব মজা করত৷ আমার খুব খারাপ লাগত৷’’

আচমকায় চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে৷ পঞ্চাশ চুঁই ছুঁই জেদী মেয়ে বলতে থাকেন, ‘‘তখনই আমার খুব জেদ চেপে গিয়েছিল৷ ঠিক করি অসাধ্য সাধন করতেই হবে৷’’ ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে দক্ষিণী মেয়ের বাঙালি বউ হয়ে ওঠার লড়াইটা শুরু তখন থেকেই৷ একা একাই বাড়িতে বসে বর্ণপরিচয় থেকে অক্ষর চিনেছেন৷ কালের নিয়মে সেই তিনি এখন ‘ন্যাশনাল রুরাল লাইভলি মিশনে’র আনন্দধারা প্রকল্পে বাংলা অনুবাদের শিক্ষক!

sunita4

তেলুগু সুনীতার বাঙালি বধূ হয়ে ওঠার কাহিনীও কম রোমাঞ্চকর নয়৷ সুনীতার কথায়, ‘‘বাঙালি আদব কায়দা, রীতি রেওয়াজ রপ্ত করতে কে কেমনভাবে কথা বলছেন, সব মন দিয়ে শুনতাম৷ রান্না-বান্না সবকিছুই দেখে দেখে শিখেছি৷’’ কথায় বলে, প্রত্যেক সফল পুরুষের পিছনে থাকেন কোনও না কোনও নারী৷ সুনীতার ক্ষেত্রে অবশ্য উলোটপুরাণ৷ স্বামীর প্রশংসায় তিনি পঞ্চমুখ৷ বলছেন, ‘‘স্বামীর জন্য এতকিছু শিখতে পেরেছি৷ ওই আমার যাবতীয় কাজের অনুপ্রেরণা, মনোবল৷’’

ছোটবেলা থেকে শিক্ষক বাবার কাছে সমাজসেবার পাঠ নিয়েছেন সুনীতা৷ গোদাবরী পেরিয়ে গঙ্গাপাড়ে এসে সুনীতাদেবী সেই শিক্ষাকেই বাস্তবে রূপ দিতে গ্রামের মহিলাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন৷ সাক্ষর করার আপ্রাণ প্রচেষ্টা করেছেন৷ গ্রাম্য মেয়েদের দিয়েছেন ক্যারাটের তালিম৷ আত্মসুরক্ষার পাশাপাশি আর্থিক সাবলম্বীর তাড়না সব সময় তাড়া করে বেড়াত তাঁকে৷ সেই তাড়না থেকেই ২০০১ সালে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মেলায় ঢেঁকিতে তৈরি মশলা বিক্রি করে রোজগারের হাতে খড়ি৷ তখন তাঁর ব্যবসার মূলধন সাকুল্যে ৫০০টাকা৷ তিল তিল করে সঞ্চয় আর মহিলাদের হাতে কলমে প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তুলেছেন তিন তিনটি স্বনির্ভর গোষ্ঠী- সারদা, মাতঙ্গিনী ও নিবেদিতা৷ ‘সফল’ সুনীতি দেবীর তিনটি স্বনির্ভর গোষ্ঠীর দিন ফুরোলে এখন গড় আয় প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা৷

দু-দু’বার হৃদ-রোগে আক্রান্ত হয়েছেন৷ তবুও জীবন-যুদ্ধে ভয়ের কাছে মাথা নত করাটা সুনীতার ‘অভিধানে’ নেই৷ চলার পথ তাঁকে শিখিয়েছে- বাধা টপকে কিভাবে এগিয়ে যেতে হয়৷ কিভাবে চ্যালেঞ্জ ‘জয়’ করতে হয়৷ বাংলার মাটিতে শয়ে শয়ে সুনীতা তৈরি করাটাই তাঁর প্রধান ‘ডেস্টিনি’৷

অসাধ্য সাধন করে তেলুগু সুনীতা এখন ষোলো আনা বাঙালি বধূ! স্বভাবতই, তাঁকে বাংলার ‘বধূ নম্বর ওয়ান’ বললে সত্যের অপলাপ হয় না৷