আমার দুর্গা-নারী গর্ভের রক্তমাংস কন্যা

50

অর্ধেক আকাশ আজও আলো খুঁজছে৷ রশ্মি আছে, তবু আঁধার কাটছে না৷ ২৪ জানুয়ারি ভারতে পালিত হয় জাতীয় শিশুকন্যা দিবস। কন্যাশিশুর প্রকৃত মূল্যায়ন কি আজ শুধুই কন্যাশ্রীর নিক্তিতে মাপা হবে? কোথায় দাঁড়িয়ে দেশের শিশুকন্যাদের অবস্থা? তাদের প্রকৃত যত্ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ শারীরিক মানসিক সবধরনের উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্যই জাতীয় শিশুকন্যা দিবসের লক্ষ্য৷ কিন্তু আদৌই কি লক্ষ্যপূরণ হচ্ছে?

কন্যাশিশুর অধিকার নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে অনেক সংগঠন। তাদের স্বার্থ সংরক্ষন করতে উদ্যোগী মানবাধিকার সংগঠনগুলো। রয়েছে সরকারি বিভিন্ন কর্মসূচি। কিন্তু সমাজের শিরা উপশিরায় মেয়েদের অস্লীল চোখে দেখার যে নজির রয়েছে, তার শেষ কোথায়? ২৪ জানুয়ারি প্রতি বছর ঘটা করে পালন করা হয় জাতীয় শিশুকন্যা দিবস। কিন্তু তার আগে দেশে মেয়েদের বর্তমান অবস্থা নিয়ে সমীক্ষা যথেষ্ট উদ্বেগ তৈরি করেছে। কন্যাভ্রূণ হত্যার মত ভয়ঙ্কর সমস্যার বাড়বাড়ন্ত এবং অপুষ্টি ও নারী শিক্ষার হতাশাজনক ছবি ক্রমেই চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

আইন প্রণয়ন হলেও তার বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে। একটি রিসার্চ গ্রুপের সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০০৯ জাতীয় শিশুকন্যা দিবস থেকে সারা দেশে মোট ৪৮১টি কন্যাভ্রূণ হত্যার অভিযোগ দায়ের হয়েছে। কিন্তু চার্জ গঠন হয়েছে মাত্র ২৭টি মামলার। ২০১১-১২ সালে ২৭৯টি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য বেআইনি ডায়গনস্টিক সেন্টার। যেগুলিতে প্রতিনিয়ত আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলছে গর্ভপাত।

২০১২ সালের অক্টোবরে মহারাষ্ট্রের থানেতে অভিযান চালানোর পর একশটি বেআইনি গর্ভপাত কেন্দ্র এবং ৩১৯টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার সিল করার নির্দেশ দেন জেলাশাসক। রয়েছে অন্য সমস্যাও। পরিসংখ্যান বলছে, সমগ্র দেশে শিশুপুত্রের তুলনায় কমছে শিশুকন্যার সংখ্যা। সবচেয়ে উদ্বেগজনক ছবি হরিয়ানার ঝাজ্জর এবং মহেন্দ্রগড় জেলার।
শিশুকন্যাকে পৃথিবীর আলো দেখানোর মতোই তাকে স্কুলে পাঠানোর পরিসংখ্যানের ছবিটাও উদ্বেগজনক। রিসার্চ গ্রুপের সমীক্ষা অনুযায়ী, একটি ৫ থেকে ২৯ বছরের ছাত্রের ক্ষেত্রে শিক্ষাখাতে বছরে যা ব্যয় হয় ছাত্রীর ক্ষেত্রে তা অনেক কম হয়ে থাকে। বিহার এবং রাজস্থানে মেয়েদের সাক্ষরতার হার সবচেয়ে খারাপ।

এসবের সঙ্গে রয়েছে অপুষ্টিজনিত সমস্যা। সমীক্ষার রিপোর্ট অনুসারে ৪১ দশমিক ৪ শতাংশ শিশুকন্যা অপুষ্টিজনিত সমস্যায় ভুগেছে। ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেল্থ সার্ভে অনুসারে মেয়েদের মধ্যে বাড়ছে রক্তাল্পতার সমস্যা। অসম, ঝাড়খণ্ড ৬৯.৫ শতাংশ নারী রক্তাল্পতার শিকার। তারপরেই রয়েছে বিহার এবং ত্রিপুরা। যথাক্রমে ৬৭ দশমিক ৪ এবং ৬৫ দশমিক ১ শতাংশ।

তবে এইসব সমস্যা সত্ত্বেও নারী শক্তি জাগরণে কিশোরী শক্তি প্রকল্প ও রাজীব গান্ধী প্রকল্পের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। নারীর বিকাশ, পুষ্টি, স্বাস্থ্য, শিক্ষার উন্নয়নে ও প্রসারে কার্যকর ভূমিকা নিয়েছে এই দুটি প্রকল্প। ২০০৮-০৯ কিশোরী শক্তি প্রকল্পে ৫২ দশমিক ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়। এখন সেই বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯৬ দশমিক ৭৩ কোটি টাকা।

তবু মুক্তি কোথায়? স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি বছর ভারতে নিখোঁজ হয়ে যায় এক লক্ষ শিশু৷ হারিয়ে যাওয়া শিশুদের ৫৫ শতাংশই কন্যা সন্তান বলে জানা গিয়েছে৷এই সব শিশুকে জোর করে ভিক্ষাবৃত্তি ও যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করতে বাধ্য করা হয়৷গত সাড়ে তিন বছরে রাজ্য থেকে হারিয়ে যাওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে আছে মধ্যপ্রদেশ৷

তবে আশার আলো যে একেবারে নেই, তা নয়৷ সম্প্রতি প্রকাশিত এক সমীক্ষা বলছে দেশের ৭৯ শতাংশ মহিলা ও ৭৮ শতাংশ পুরুষ চায় তাদের যেন অন্তত একটা মেয়ে হয়৷ ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে এই গবেষণাটি চালিয়েছে৷ তারা জানিয়েছে, ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী মহিলা ও ১৫ থেকে ৫৪ বছ বয়সী পুরুষের মধ্যে এই সার্ভে চালানো হয়৷ তারাই এমন কথা জানিয়েছে৷ এমনকী আদিবাসী, মুসলিমদের মধ্যেও এই সার্ভে চালানো হয়৷ তাদেরও এই একই মত৷ তারাও জানিয়েছে তারা চায়, তাদের একটা সন্তান যেন মেয়ে হয়৷

এ প্রসঙ্গে আরও একটি কথা উল্লেখ্য, বিহার ও উত্তরপ্রদেশ, যেখানে সবচেয়ে বেশি কন্যাভ্রুণ হত্যা হয়, সেখানকার বেশিরভাগ মহিলাই চায় তাদের কন্যাসন্তান হোক৷ পুত্রসন্তান নয়৷