দেবীর আরাধনায় ঝড় তুললেন এই মহিলা পুরোহিত

14945

গোঁড়া ব্রাহ্মণ্যবাদকে দেখালেন বুড়ো আঙুল৷ ফিরিয়ে আনলেন অতীত ভারতের নারী স্বাধীনতার পর্ব৷ গার্গী-অপালার সেই উন্মুক্ত চিন্তাধারার সঙ্গী সমকাল৷ সেই ধারাকেই সিঞ্চন করেছেন মঞ্জরী৷ কথা বললেন দেবযানী সরকার৷

পর্দার আড়াল থেকে ঘরের বাইরে পা রাখতে চোয়াল শক্ত করে ‘বিপ্লব’ করে গিয়েছে মেয়েরা৷ ধীরে ধীরে তথাকথিত পুরুষ পেশায় প্রবেশ করেছে তারা৷ তার পরেও সামাজিক লক্ষণরেখার বাঁধন ছিল মেয়েদের সামনে৷কলেজ পড়ুয়া মঞ্জরী চক্রবর্তী মেয়েদের বিপ্লবকে আরও তরান্বিত করলেন৷ পুরোহিত হিসেবে আত্মপ্রকাশ হল তাঁর৷

গলায় পৈতে, কুচোনো ধুতিতেই পুরোহিতদের দেখতে আমরা অভ্যস্ত৷ কিন্তু এবছর সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়ে বাগদেবীর আরাধনায় এবার অন্য ছবি৷ যে ছবি দেখতে একেবারেই অভ্যস্ত নয় সমাজ৷ পুরোহিতের আসনে শাড়ি পড়া এক যুবতী, যিনি গড়গড় করে সংস্কৃতে পুজোর মন্ত্র পড়ে যাচ্ছেন৷

purohit-3
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরাজি অনার্সের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী মঞ্জরী চক্রবর্তী৷ আসানসোলের এই মেয়েটি ছোট থেকেই আধ্যাত্মিক জীবনে অভ্যস্ত৷ মঞ্জরীর কথায়, ক্লাস সেভেনে সংস্কৃত ছিল৷ আমাকে যিনি সংস্কৃত পড়াতেন সেই শিক্ষিকা অসাধারণ মন্ত্রোচ্চারণ করতেন৷ তাঁর থেকেই অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম৷তারপর বাড়িতে মা’কে পুজো করতে দেখতাম৷পাশে থাকতাম৷ কী কী লাগে সবই জানি৷ তাই কোনও অসুবিধা হয়নি৷ সামলে দিতে পেরেছি৷

মঞ্জরীর পরিবারের কেউ কোনওদিন পুরোহিত ছিলেন না৷ সেই প্রথা ভাঙল, আবার নজির গড়ে মহিলা পুরোহিত হলেন কেন ? মঞ্জরী বলেন, আমাদের ইউনিভার্সিটিতে গত দশ বছর ধরে স্টুডেন্টরাই সরস্বতী পুজো করছে৷ এবার কোনও ছেলেদের পাওয়া যাচ্ছিল না পুজোর জন্য৷ যাদেরকেই বলা হচ্ছিল তারাই বলছিল কাজ আছে৷ আমিও আমার অনেক বন্ধুকে ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করেছিলাম৷ কিন্তু সবাই হতাশ করেছিল৷ খুব বিরক্ত হয়েই একদিন ইউনিয়ন রুমে বসে আমি বলেছিলাম ছেলেদের অনেক ভাও বেড়ে গেছে৷ আমাকে দায়িত্ব দিলে আমিই পুজোটা করে দিতাম৷ কথাটা জিএস-এর কানে কোনওভাবে গেছিল৷ তারপর সবাই খুব উৎসাহ নিয়ে আমাকে পুজো করতে বলে৷ প্রিন্সিপ্যাল ম্যাম ও খুব উৎসাহ জুগিয়েছেন৷আমাকে পুজোয় সাহায্য করেছেন আমাদের এক সিনিয়ার সব্যসাচী রায়৷purohit-2

 

মঞ্জরীর কথায়, আমাদের ইউনিভার্সিটিতে অনেক নিয়ম মেনে পুজো হয়৷ যজ্ঞ হয়৷প্রস্তুতি নিতে আমার দুদিন সময় লেগেছিল৷ পুজো করতে লেগেছে টানা দুঘন্টা৷ সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পলা বন্দ্যোপাধ্যায়ও ভীষণ গর্বিত তাঁর এই ছাত্রীকে নিয়ে৷ তাঁর কথায়, ছাত্রছাত্রীরা যখন এত সাহসী পদক্ষেপ করছে সেখানে কর্তৃপক্ষ হিসেবে আমার এগিয়ে আসা উচিত বলেই মনে করেছি৷

মঞ্জরী নিজেও ভীষণ খুশি তাঁর নতুন পরিচয়ে৷ তিনি বলেন, ছোটবেলায় ফুটবল খেলতে চাইতাম৷ এটা ছেলেদের খেলা বলে বাবা খেলতে দিলেন না৷ খুব কষ্ট হয়েছিল৷এখন খুব ভাল লাগছে৷ তথাকথিত পুরুষদের কাজ বলে যেটা সমাজে চলে সেই কাজ সফল ভাবে করতে পেরে৷ দ্বিতীয় বর্ষের এই ছাত্রী চান সমাজে নারী-পুরুষের মধ্যে কাজের বিভেদ বন্ধ হোক৷

বিভিন্ন চরিত্রের মানুষের সঙ্গে মেশাই মঞ্জরী হবি৷ ভবিষ্যতে সে লেখক হতে চায়৷ তবে পুরোহিত হওয়ার ইচ্ছেও তার ষোলআনা৷ মঞ্জরীর কথায়, গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে এসব নিয়ে চর্চা করার ইচ্ছা আছে৷ এবার দক্ষিণা না নিলেও ভবিষ্যতে পেশাদার পুরোহিত হতে চায় মঞ্জরী৷