কালো মেয়ের কালো হরিণ চোখ..

387

পর্ণা সেনগুপ্ত: অবশেষে কোনওভাবে একটা তারিখ মিলেছে৷ পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে মেয়েটিকে৷ সেই থেকে ‘অত্যাচার’ শুরু৷ কাঁচা হলুদ, দুধের সর, মুলতানি মাটি, ফর্সা হওয়ার ক্রিম- আরও কত কি৷ শত উপচারের অত্যাচারে অনুচ্চারিত থেকে যায় এম.এ পাশ মেয়েটির প্রতিবাদ৷ চাকরি করার স্বপ্ন আপাতত ধূলিসাৎ হয় শুধু ‘পাত্রস্থ’ হওয়ার লক্ষ্যপূরণে৷ একুশ শতক নাকি নারীর ক্ষমতায়ন প্রত্যক্ষ করবে? তেমনই তো কথা ছিল৷

সমাজ প্রতিমুহূর্তে চায়, ফর্সা মেয়ে, ফর্সা পাত্রী৷ বায়োডেটা কে দেখে? এম.এ পাশ হোক, বা কোনও শিল্পে পারদর্শী৷ বিয়ের বাজারে যে যত ফর্সা, তার কদর তত বেশি৷ আর কালো মেয়ের কদর তো নেই-ই৷ দরও কম৷ শ্যামাঙ্গীর ক্ষেত্রে মোটা যৌতুক ছাড়া উপায় কোথায়৷ ব্যতিক্রম নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু ব্যতিক্রম তো বাস্তব নয়৷ পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনার মতো অলীক সুখ!
বাস্তব কি বলছে? এই একুশ শতকেও গায়ের রং কালো হলে ‘মেয়ের বিয়ে কী করে হবে’ – এই ভাবনায় কাহিল হতে হয় বাবা-মা-কে। জন্মের পর থেকেই চলে মেয়েকে ফর্সা করার প্রাণান্ত চেষ্টা। সমাজকে তৈরির চেষ্টাই বা কোথায়? সাহিত্যে কালো মেয়ের প্রশস্তির আদর্শ উদাহরণ খুঁজতে গেলেই সবার আগে উঠে আসে রবীন্দ্রনাথের ‘কৃষ্ণকলি’।
‘কালো? তা সে যতই কালো হোক,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
তবে যাই বলুন এ শুধু ওই কবিতাতেই ভালো লাগে৷

সম্প্রতি নজরে এসেছে একটি ওয়েবসাইটের বিজ্ঞাপন৷ তা কি বলছে সেই সাইট৷ সেই সাইট বলছে পাত্রী খুঁজছেন, সাহায্য করব আমরা৷ সেই সাহায্যের নামে হরেক কিসিমের পাত্রীর পসরা নিয়ে বসেছে তারা৷ ক্যাটাগরি দেখে পছন্দের বউ বেছে নিলেই ব্যাস! কেল্লা ফতে ৷
কেমন পছন্দ শুধু বলে ফেলুন একবার৷ লম্বা না বেঁটে, ফর্সা না কালো, হাইপ্রোফাইল নাকি ঘরোয়া? খুঁজে নেওয়া যাবে এক ক্লিকে। ছবিতে দেখুন, কার্যত পণ্যে পরিণত করা হয়েছে মহিলাদের।
fair-bride--picMySoniKudi.com- এই ওয়েবসাইটে চোখ রাখলেই বোঝা যাবে সমাজ এখনও কতটা পিছনে পড়ে আছে। ক্লিক করলেই বেরিয়ে আসবে একের পর এক ক্যাটাগরি। কোন মেয়ে বরের গ্যাঁটের পয়সা বেশি খরচ করবে না, সেটারও নাকি একটা ক্যাটাগরি আছে। রয়েছে ঘরোয়া, সুশীল, সঞ্চয়ী এমন নানা ধরনের ক্যাটাগরি।

তবে শুধু ওয়েবসাইটকেই বা দোষ দিই কেন৷ খবরের কাগজ খুলুন৷ সোজা চলে যান পাত্র পাত্রীর বিজ্ঞাপনে৷ ফর্সা পাত্রী চাই বলে বিজ্ঞাপনের রমরমা সেখানে৷ সর্বত্র তথাকথিত ফর্সা মেয়ের চাহিদা। ফ্রন্ট ডেস্ক কিংবা রিসেপশনে, নাটকে, সিনেমায়, অনুষ্ঠান উপস্থাপনায়, সংবাদ পাঠে- সব জায়গায়৷ রং ‘ফর্সা’ নয়, অথচ খুব যোগ্য- এমন কেউ কেউ কালেভদ্রে সুযোগ পেয়েছেন বৈকি। তবে কালো রং আড়াল করে, অর্থাৎ চড়া প্রসাধনে ত্বক ঢেকে তবেই তারা পেয়েছেন যোগ্যতা প্রকাশের সুযোগ।
গায়ের রং কালো হওয়ায় গৃহবধূকে পুড়িয়ে মারার ভুরি ভুরি অভিযোগে ঢেকে যায় সংবাদপত্রের পাতা৷ কালো কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ায় মেরে ফেলা হয় মা ও মেয়েকে৷ কোথায় শেষ এর?

fair-bride--pic-2
রবি ঠাকুর থেকে হালের মল্লিকা সেনগুপ্ত৷ কবির লেখায় বারবার এর প্রতিবাদ এসেছে৷ কিন্তু ওই পর্যন্তই৷ কৃষ্ণকলির কালো হরিণ চোখ শুধু কাব্যেই মন ভোলায়, বাস্তব তো বুঝেছেন গুরুদেবও৷ নয়তো ‘কালো মেয়ে’র জন্ম হতো না৷ পাশের বাড়ির কালো মেয়ে নন্দরানী উঠে আসত না লেখায়৷

বিয়ের বাজার যে একমাত্র গন্তব্য নয়, সেটা মেয়েদের নিজেকে বুঝতে হবে৷ তারপর মেয়ের পরিবারকে৷ দামী পাত্র নয়, ভালো চাকরি৷ নিজের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, শ্বাস ফেলার অবকাশ৷ সেই স্বাধীনতা কিন্তু কালো ফর্সা দেখে না৷ রং বিচার না করে মন বিচার করুন৷ সংসার সুখের হবে সেই কালো রমণীর গুণেই৷