চিনে কত্থক শেখাচ্ছেন এই বাঙালি যুবতী

1402

ভারতীয় সংস্কৃতির অন্যতম অঙ্গ কত্থক৷ সেই সংস্কৃতির সঙ্গে চিনাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধছেন বছর তিরিশের এক বাঙালি যুবতী৷  প্রায় বছর দেড়েক ধরে চিনে কত্থক শেখাচ্ছেন তিনি৷ এখন তাঁর ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ১৫০ জন৷  সেই দেশের রাজধানী  থেকে লোকেশ্বরী দাসগুপ্তর সঙ্গে কথা বললেন দেবযানী সরকার

দেখতে অনেকটা মঙ্গোলীয় বা নেপালি আদলের৷  তবে আদ্যোপান্ত বাঙালি৷  গোখেল মেমোরিয়াল স্কুলের প্রাক্তনী, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উইমেন স্টাডিজে এ এম.ফিল করা লোকেশ্বরী কত্থকের টানেই দুর্দান্ত অ্যাকাডেমিক কেরিয়ারে ইতি টেনেছেন৷  বছর দেড়ের আগে আইসিসিআর-এর ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন দেখে আবেদন করেছিলেন লোকেশ্বরী। দিল্লির আজাদ ভবনে ইন্টারভিউ দিয়ে জিতে নিয়েছিলেন বেজিংয়ের ছাড়পত্র, অন্য দেশের সামনে নিজের দেশের শিল্প সংস্কৃতি তুলে ধরার অনন্য সুযোগ। বর্তমানে ভারত সরকারের ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনস-এর পক্ষ থেকে চিনের রাজধানী বেজিংয়ে কত্থক শিক্ষিকা তথা পারফর্মার হিসেবে নিযুক্ত তিনি।

lokeshwari

লোকেশ্বরীর পায়ে যখন ঘুঙুর উঠেছে তখন তাঁর বয়স মাত্র আড়াই৷ ওই বয়সেই মঞ্চ মাতিয়েছে সে৷ কত্থকে একমাত্র শিক্ষাগুরু তাঁর মা সুরঙ্গমা৷ তিনি নিজে একজন প্রতিষ্ঠিত নৃত্যশিল্পী। লোকেশ্বরী ভরতনাট্যমের তালিম পেয়েছেন শ্রী পি.টি. নরেন্দ্রনের কাছে।

লোকেশ্বরীর কথায়, এখানে কত্থক শিক্ষক হিসেবে আমার পোস্টিং৷ কিন্তু আমি আমার ছাত্র-ছাত্রীদের ভারতনাট্যম এবং মাঝেমধ্যে ফোক ডান্সও শেখাই৷ এরা সাধারণত ব্যালে স্টাইলে নাচ করে৷ এদের নাচের ফর্মের চেয়েও যেটা আমাকে বেশি আকৃষ্ট করে সেটা হল এখান স্টেজ সেট আপ, আলোকসজ্জা, পোশাক এবং যেভাবে গোটা অনুষ্ঠানটার আয়োজন করা হয় সেটা৷  আমাদের দেশে এরকম হলে দারুণ হবে৷

মায়ের সঙ্গে
মায়ের সঙ্গে

অ্যাকাডেমিক কেরিয়ারে ইতি টানা নিয়ে কোনও আক্ষেপ নেই লোকেশ্বরীর৷ বরং চিনে কত্থক শেখানোটা তিনি উপভোগ করেন৷ লোকেশ্বরীর কথায়,  বিদেশে ভারতীয় শাস্ত্রীয় নাচের প্রতি যে কী আগ্রহ, না দেখলে বিশ্বাস হবে না! ভারতীয় নাচের মুদ্রা, তাল, লয়, অভিনয় নিয়ে ইউরোপ, আমেরিকা, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো পাগল! কাজেই আইসিসিআর আমাকে যখন সুযোগ দিল, হাতছাড়া করিনি।’’ এই মুহূর্তে বেজিংয়ে লোকেশ্বরীর ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা প্রায় ১৫৫ জন৷

তবে লোকেশ্বরীর মতে ভারতে শুধুমাত্র ক্লাসিকাল নৃত্যের উপরে ভর করে আর্থিক সচ্ছলতা ধরে রাখাটা খুব কষ্টকর৷ তাঁর কথায়,  আমাদের দেশে মানুষ যেভাবে বলিউড ডান্স বা জুম্বার পেছনে ছোটে সেখানে পুরো ক্লাসিকাল নিয়ে এগোনোর পথ সহজ নয়৷ অনেক সময় এরকম যায় যখন স্টুডেন্ট কমে যায় বা পারফরমেন্সের সুযোগ কম থাকে৷ সেইসময় ধৈর্য্য ধরে পথ আঁকড়ে ধরে থাকাটাই আসল৷ আমাকেও অনেক ধৈর্য্য ধরতে হয়েছে৷

lokeswari2

কত্থকের ভবিষ্যৎ নিয়েও আশাবাদী লোকেশ্বরীর কথায়, ‘‘ইতিহাসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কত্থক বারবার তার রূপ পালটেছে।  বিক্রম আয়েঙ্গার, অসীমবন্ধু ভট্টাচার্য, অদিতি মঙ্গলদাস, আমার মা অসাধারণ সব বিবর্তন আনছেন। আমিও কত্থককে এই পথেই এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।’’

এখনই দেশে ফেরার ইচ্ছে নেই লোকেশ্বরীর৷ আরও কিছুদিন চিনে থাকতে চান তিনি৷ তবে ভারতেই ফিরে একটা ইনস্টিটিউশন গড়ে তুলতে চান লোকেশ্বরী৷ ভারতীয় শিল্পের সব ফর্ম সেখানে শেখানো হবে৷ দেশ-বিদেশ থেকে ছাত্রছাত্রীরা আসবেন, থাকবেন, শিখবেন৷ আপাতত এটাই স্বপ্ন৷