সেই ছদ্মবেশী রানির লড়াই…

2476
নিঃশব্দেই চলে এসেছে তাঁর মৃত্যু বার্ষিকী৷ তিনিও রানি হয়েছিলেন৷ তবে ক্ষণিকের জন্য-লড়াইয়ের ময়দানে৷ অসাধারণ বীরাঙ্গনাকে মনে না রাখলেই মনে হয় ভারত সুখী থাকে!!
প্রসেনজিৎ চৌধুরী: দূর থেকে মূর্তিটা দেখলে মনে হবে সত্যি কত চেনা৷ সেই দৃপ্ত ভঙ্গী, প্রবল সাহসের প্রতীক৷ একইরকম লড়াকু ইমেজ৷ সবমিলে আমিও প্রথমবার ভুল করেছিলাম৷ যেমন অনেকই করে৷ তবে কাছে যেতেই ভুল ভেঙেছিল৷ পেয়েছিলাম রানি লক্ষ্মীবাঈয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক অকথিত ইতিহাসের খোঁজ৷ এ কথা কেউ তেমন বলে না…
বীরাঙ্গনা ঝলকারী বাঈ৷ নিশ্চই নামটা অচেনা৷ ভারতীয় ইতিহাসবিদরা তো বটেই, প্রগতিশীল ইতিহাস বিশ্লেষকদের রাশি রাশি বক্তৃতায় এই যোদ্ধার কথা মেলেনা তেমন৷ তবে ঝলকারী বাঈ বেঁচে রয়েছেন বুন্দেলখণ্ডের লোকসঙ্গীতে৷ চম্বল নদীর দুই তীরের জনবসতির মধ্যে, ঝাঁসি শহরের রাজপথে কোনও এক অটো চালকের মনে৷
ঝলকারী বাঈয়ের সম্পর্কে প্রথমেই একটা কথা প্রথমেই বলে নেওয়া ভাল,তিনি যদি ছদ্মবেশ না ধরতেন তাহলে রানি লক্ষ্মীবাঈকে আর গোয়ালিয়র পৌঁছতে হতনা!!
মহাবিদ্রোহের সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাত্র দেড় হাজার সেনার কাছে ঝাঁসির বিশাল ফৌজ পিছু হটেছিল৷ আর দুর্গে অবরুদ্ধ লক্ষ্মীবাঈ চাইছিলেন নতুন করে লড়াই করতে৷ তাঁর লক্ষ্য যে করেই হোক গোয়ালিয়র দুর্গটি দখল করা৷ কিন্তু যাবেন কেমন করে ? ঝাঁসির বাইরে তখন কর্নেল হিউজ রোজের সেনা ছাউনি তৈরি করে বসে আছে৷ এমনই সময়ে একটা দুর্দান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন লক্ষ্মীবাঈ৷ ১৮৫৮ সালের সালের ৩১ মার্চের দিন ঝাঁসির সেনা তখন পরাজয়ের মুখে৷ এদিকে লড়াই জারি রাখতে মিরাকল ঘটিয়ে ফেলেন লক্ষ্মীবাঈ৷ সন্তানকে পিঠে নিয়ে প্রিয়তম অশ্ব বাদলের সাহায্যে ঝাঁসির দুর্গ থেকে লাফ দিয়ে চোখের পলকে মিলিয়ে গিয়েছিলেন৷ লক্ষ্য গোয়ালিয়র দখল করে পরবর্তী আক্রমণের পরিকল্পনা৷ ঝাঁসি দুর্গের যে স্থান থেকে রানি ঝাঁপ দিয়েছিলেন সেখান থেকে পড়লে কেউই বাঁচবে না৷ উপর দেখলে সেটাই মনে হয়৷ তবে মিরাকল একবারই হয়, যেমনটা হয়েছিল লক্ষ্মীবাঈয়ের ক্ষেত্রে৷
তারপর ? তারপর প্রায় অকথিত সেই ঘটনা৷ ১৮৫৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ঝাঁসির মাটিতে পতনের ইতিহাস লেখা হয়েছিল৷ একইসঙ্গে উঠে এসেছিল এক বীরাঙ্গনার কথা৷ যাকে নিয়ে আগ্রহ নেই তেমন৷ তিনি ছদ্মবেশী রানি৷ লড়াই করেছিলেন সামনে দাঁড়িয়ে৷ যতক্ষণ পেরেছিলেন প্রায় একাই তলোয়ার চালিয়েছিলেন৷ এতেই চমক লেগেছিল পোড় খাওয়া ব্রিটিশ সেনাপতি ও ঝাঁসি যুদ্ধের নায়ক জেনারেল হিউজ রোজের৷
লক্ষ্মীবাঈ ও ঝলকারী বাঈ
লক্ষ্মীবাঈ ও ঝলকারী বাঈ
আগে অনেকবার খুব কাছ থেকে রানি লক্ষ্মীবাঈকে দেখেছিলেন হিউজ রোজ৷ ফলে তাঁর মনে প্রশ্ন উঠেছিল যুদ্ধক্ষেত্রে ইনি কে ? প্রচণ্ড গতিতে বারে বারে কোম্পানির সেনাকে নাস্তানাবুদ করা এই মহিলার পরিচয় কী ? প্রাথমিকভাবে হিউজ রোজের মনে হয় লক্মীবাঈ নিজেই লড়াই করছেন৷ তাহলে কি কেল্লা থেকে ঝাঁপ দিয়ে লক্ষ্মীবাঈয়ের গোয়ালিয়র চলে যাওয়া রটনা ? কারণ যুদ্ধরত সেই মহিলার একই রকম ক্ষিপ্রতা, আঘাত করার পদ্ধতিও একই৷ তাহলে কি রানি ফিরে এসেছেন ? ঝাঁসির মূল ফটকের সামনে তীব্র লড়াইয়ের মাঝে ঘুরছিল এই প্রশ্ন৷
তবে সেদিন এই বীরাঙ্গনার প্রবল লড়াইও ম্লান হয়েছিল৷ অবশেষে যুদ্ধরত অবস্থায় মৃত্যু হয় তার৷ কাছে যেতেই চমক ভাঙে জেনারেল হিউজ রোজের৷ আরে এ তো রানি লক্ষ্মীবাঈ নয় !! পরে সত্যিটা প্রকাশ পায়৷ এই মহিলা আসলে ঝলকারী বাঈ৷
জন্ম হয়েছিল এক হত দরিদ্র দলিত পরিবারে৷ প্রবল সাহসের কারণে লক্ষ্মীবাঈয়ের নারী বাহিনীতে স্থান করে নিয়েছিলেন ঝলকারী৷ বাকিটা আপনাদের আগেই শুনিয়েছি৷ এই অকথিত কাহিনী আমি শুনেছিলাম ঝাঁসির রাস্তায়৷ তাঁর কথা বলেছিলেন আলো ঝলমলে রেস্তোরাঁর রাঁধুনি, স্টেশনের টিকিট চেকার৷ অনুচ্চারিত ইতিহাসের খোঁজ করার ইচ্ছা থেকেই যোদ্ধা ঝলকারী বাঈয়ের প্রতি শ্রদ্ধা৷