এই নারী দিবসে ট্যাবু ভাঙুন

421

পর্ণা সেনগুপ্ত: আলো আসুক অর্ধেক আকাশে৷ আর কতদিন মেঘলা দিনে রোদের প্রত্যাশা করব? ঋতুস্রাব নিয়ে লজ্জায়, ভয়ে, লুকিয়ে থাকা কথারা এবার দিনের আলো দেখুক৷ হ্যাঁ, সেটা সহজ নয়৷ দীর্ঘদিনের জমাট বাঁধা জগদ্দল পাথর ভাঙবেন কি করে? প্রতিঘাত তো আসবেই৷

কিন্তু তৈরি নই আমরা? আমরা যারা প্রতিদিন বাইরে বেরোই, প্রতিদিন যুদ্ধ করি ঘরে-বাইরে, একটা পুরুষদের সঙ্গে সমান তালে পা মিলিয়ে চলে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরি, তারা? এখনও লজ্জা?

কিসের লজ্জা? ঋতুস্রাব হওয়া সুস্থ নারী শরীরের লক্ষ্মণ৷ কেন সেই পাঁচ দিন মন্দিরে প্রবেশ নিষিদ্ধ? কেন সে সময় কোনও শুভ অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ? কেন না চাইলেও অচ্ছুতের মত থাকতে হবে আমায়? ঋতুস্রাব শেষ হলে কেন আমাকে ‘পরিচ্ছন্ন’ হতে হবে? শুদ্ধ হতে হবে তারপর মন্দিরে প্রবেশের অধিকার পাব আমি?

প্রশ্ন তুললে, তালিকা ক্রমশই বাড়বে৷ তার চেয়ে প্রশ্ন থাক৷ উত্তর খুঁজি চলুন৷ নিজেরাই তৈরি করি সমাধান৷ ওই লাইনগুলো মনে পড়ে? মনসামঙ্গল কাব্যের ‘মানুষই দেবতা গড়ে, তাহারই কৃপার প’রে, করে দেব-মহিমা নির্ভর’৷ বড় সত্যি কথা৷ না? মানুষের প্রয়োজনেই ধর্ম, দেবতা, নিয়মের বেড়াজাল৷ সেই বেড়াজালে মেশে ক্ষুদ্র স্বার্থ৷ তখনই তৈরি হয় কিছু অদ্ভুত নিয়ম৷ যার গোলকধাঁধায় পড়ে সারাজীবন চরকি কাটি আমরা, মেয়েরা৷
জীবনের ঘুর্ণিপাক বন্ধ হোক৷ খুব জরুরি এটা৷ কেন জানেন? নারী শরীরের কোনও একটা দিক অবহেলা করা মানেই আরও বিপদের দিকে ঠেলে দেওয়া৷ ঋতুস্রাবের মধ্যেই যে আগামি জীবনের সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে, তা কে বুঝবে? আর কবে বুঝবে? ঋতুস্রাবের প্রতিটি খুঁটিনাটি আলোচনা হোক নিজেদের মধ্যে৷ তাতেই সুস্থ থাকার চাবিকাঠি লুকিয়ে৷

বন্ধুদের মধ্যে আলোচনা যে কোনও সমস্যার সমাধান করতে পারে৷ প্রতিবাদের ভাষাও তৈরি হোক সেখান থেকেই৷ পথে নেমে না হোক৷ বাড়ি থেকেও একটা নি:শব্দ বিপ্লব জন্মাতে পারে৷ আগে বাড়ির বড়রা বুঝুন,তারপর গোটা বিশ্ব৷ ছোট্ট ছোট্ট পায়ে চলতে চলতেই তো চাঁদের পাহাড় পাওয়া যায়৷ তাই না?
তাই স্বাস্থ্য সমস্যায় মুখ খুলুন৷ কথা বলুন৷ এগিয়ে আসুন অন্যের সমস্যায়৷ মুখ টিপে হেসে চলে যাওয়ার তো লোক রইলই সমাজ জুড়ে৷ বন্ধু কতজন হয়?

এই নারী দিবসে তাই নিজেরাই নিজেদের বন্ধু হয়ে উঠি৷ সমান অধিকারের লড়াই তখনই সার্থক যখন এই দৈন্যতা কাটবে৷ সমান অধিকারের কথা তখনই জোর পাবে যখন এই বেড়াজাল ভেঙে সরব হব আমরা নিজেরা, আমাদের চারপাশের মেয়েরা৷ যারা সেই দৈন্যতা ভাঙতে চাইছেন, তাঁরা নারীবাদী নন৷ তাঁরা শুধু নারী৷ ভাবুন, ভাবা প্রাকটিস করুন৷