রাজকন্যা থেকে ফুলন দেবী, শেখা শুরু হোক অন্দরমহলেই

279

বিশাখা পাল: জন্মের পর তাঁদের হাত ধরেই শুরু হয় গুটি গুটি পথ চলা৷ তাঁদের সোহাগেই ভরে ওঠে একটা মেয়ের অন্তরের আস্ত ক্ষুদ্র জগৎ৷ কখন যেন নিজের অজান্তেই “মায়ের মতো হতে চাওয়া”-র ইচ্ছা ঘাড়ে চেপে বসে৷ বড় হয়ে “মায়ের মতো হব”৷ আত্মীয়রা জিজ্ঞাসা করলেই প্রায়ই এই উত্তর আসে খুদে রাজকুমারীদের কাছ থেকে৷

কিন্তু তারপর স্কুলে ভর্তি, রোজ রোজ হোমটাস্কের ঝকমারি… আরও কত কী৷ তখনই সেই মায়ের আদরের ঘনঘটা মেয়ের কাছে ফিকে হয়ে যায়৷ মা কিন্তু চেষ্টার ত্রুটি করে না৷ কিন্তু পাল্লা দিয়ে বেড়ে ওঠা শাসন তখন ভিলেন৷ মা তখন চিরশত্রু৷ বয়স এক পা এক পা করে এগিয়ে চলে৷ সেই সঙ্গে মায়ের সঙ্গে মেয়ের বাঁধনও শিথিল হয়ে যায়৷ কিন্তু কতদিন? একসময় এই মায়েরাই মেয়েদের কাছে টেনে নেয়৷ হয়ে যায় বন্ধু৷ মেয়েটির বয়স তখন ষোলো কি সতেরো৷ তবে এসম্পর্ক সহজে তৈরি হয় না৷ আগ বাড়িয়ে ভিত গাঁথতে হয় মাকেই৷

যৌবন তখন সদ্য দেহে আলো ছড়াচ্ছে৷ ষোড়শীর বাড়ন্ত দেহে হাত পা ছড়িয়ে খেলা করছে রূপ৷ আর এই নিষ্পাপ শরীরের দিকে তাকাচ্ছে হাজার হাজার পশুর দল৷ নরখাদকের কষ গড়িয়ে তখন পড়ছে লোলুপতার রক্ত৷ কিন্তু ষোড়শী অত কিছু বোঝে না৷ দেহের সঙ্গে মনও তখন তাঁর পরিপূর্ণতা পাচ্ছে৷ বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে যাওয়া, পার্টি করা তখন তার কাছে রঙিন৷ এই তো জীবন৷ এসব না পেলে জীবনটাই বৃথা৷ মন তখন চাইছে “বাঁধ ভেঙে দাও… ভাঙো”৷ এমন দিনের হাতছানি এড়াতে পারে না কেউই৷ বিশেষত কৈশোর থেকে সদ্য যৌবনের ক্লাসে ওঠা সীতা বা গীতা৷ মায়ের কথা মানেই তখন খারাপ৷ তখন যদি মেয়েটিকে বলা হয় যেয়ো না, খারাপ তো সে ভাববেই৷ উলটে দুচারটে কথা শুনিয়ে দিতেও ছাড়বে না৷ মায়ের মন তখন ভার৷ এত করে যাকে বাঁচাতে চাইছে, সেই যদি অন্ধকারে ঝাঁপ দিতে চায়, তাহলে কীই বা করার থাকে? বিশেষ করে হাত পা যখন বাঁধা? তখন বন্ধু হতে গিয়েও মায়েদের পিছিয়ে আসতে হয়৷ কিন্তু তাতে কি লাভের লাভ কিছু হয়?

হয়তো না৷ ওই যে একটু আগে বললাম, ভিত গাঁথতে হয় মাকেই৷ কারণ তিনি যে অভিজ্ঞ৷ জগতকে অনেক বেশি দেখেছেন৷ তাই এক অঙ্কুরিত বীজকে বৃক্ষ করে তোলার দায়িত্ব তারই৷ বাড়ির মেয়েকে ভবিষ্যতের বনস্পতি করে তুলতে গেলে আরও এক বনস্পতিকেই তো দায়িত্ব নিতে হবে৷

যদি এই দায়িত্ব না নেওয়া যায়, তবে আগামীতে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে ষোলো আনা৷ এমন দিনে ডোর ধরতে হয় মাকেই৷ বন্ধু তাকে মেয়ের হতেই হবে৷ নাহলে নরখাদকের দল গিলে ফেলবে তার সাধের রাজকন্যাকে৷ এমন ক্ষেত্রে মেয়ের বন্ধু হওয়াই যুক্তি সঙ্গত৷ শাসনে এই বরফ গলবে না৷ এর জন্য দরকার ধৈর্য্য৷ মেয়ে পার্টিতে যাবে, যাক না৷ বারণ কেন? বরং তাকে এমনভাবে গড়ে তুলুন যাতে নিজের রক্ষা সে নিজেই করতে পারে৷ এর সূচনা হোক বাড়িতেই৷ চার দেওয়ালের মধ্যেই মিষ্টি রাজকন্যা শিখুক দরকার পড়লে তাকেও ফুলন দেবী হয়ে উঠতে হবে৷

রাতবিরেতে বাড়ির বাইরে বেরোতেই হয়৷ বিশেষত এখনকার দিনে চাইলেও সন্ধ্যা নামলেই ঘরবন্দি থাকা সম্ভব নয়৷ ঘড়ির কাঁটা যখন নয়ের ঘর পার করে যায়, মানুষরূপী হায়না বের হয় তখনই৷ দিনের আলোয় যে বেরোয় না, তা নয়৷ তবে সূর্যদেব তখন মধ্যগগনে বিরাজমান৷ তাই যা হয় ছায়ার আড়ালে৷ কিন্তু রাতে সেসবের বালাই নেই৷ তাই এমন সময় বেরোতে হলে মেয়েকে নিজের গাড়ি ব্যবহার করতে বলুন৷ আর যদি কোনও প্রাইভেট গাড়ি ভাড়া করতেই হয়, শর্টকাট এড়িয়ে চলতে বলুন৷ ওখানেই কিন্তু জাল পাতা থাকে বেশি৷

মেয়ের নিশ্চয়ই স্মার্টফোন রয়েছে? সেখানে ইনস্টল করে দিন সিকিউরিটি অ্যাপ৷ এদেশে মহিলাদের সুরক্ষার্থে খুব বেশি না হলেও অ্যাপ যে একেবারই নেই তা নয়৷ আর অ্যাপ যদি নাও থাকে, অন্তত হেল্পলাইন নম্বর যেন সবসময় থাকে ফোনে৷ পরিস্থিতি একটু এদিক থেকে ওদিক হলেই যেন এক ডায়ালে ফোন চলে যায় পুলিশের কাছে৷

অনেক সময় পরিস্থিতি এমন আসে, রাস্তায় টুকরো মন্তব্য ছুঁড়ে দেয় পাশের লোকটি৷ এসব কিন্তু একেবারেই বরদাস্ত করা ঠিক নয়৷ অনেকে মনে করতেই পারেন, এ তো নিছক হালকা ব্যাপার৷ এত মাথা ঘামালে রাস্তায় চলা যায় না৷ প্রতি পদক্ষেপে নাজেহাল হতে হয়৷ মনে হতেই পারে, আজ প্রতিবাদ করলে কাল সে ডাবল শক্তি নিয়ে টিজ করবে৷ করাটা অসম্ভব নয়৷ সেক্ষেত্রে নিজেকেই সেভাবে তৈরি করতে হবে৷ আজ আপনার নির্বাক থাকাই কিন্তু কাল কোনও মেয়ের ধর্ষণের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে৷ এরপরও যদি মনে হয়, “হালকা ব্যাপার”, তাহলে চুপ থাকাই আপনার পক্ষে শ্রেয়৷ কিন্তু তা যদি না হয়, তবে গর্জে উঠতে শেখান মেয়েকে৷

আজকাল হাজার কাজে হাজার জায়গায় যেতে হয়৷ নারী পুরুষ এখন সমান সমান৷ এমন ক্ষেত্রে সর্বত্র ছেলেরা থাকবেই৷ থাকাটাই স্বাভাবিক৷ কিন্তু তাই বলে নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকাটা ঠিক নয়৷ যদি খুব চেনাশোনাও কেউ হয়, পুরুষ মাত্রই তাকে নজরে রাখা ভালো৷ তার ব্যবহার, তার আদবকায়দা সব কিছুই তীব্রভাবে খেয়াল করতে শেখান মেয়েকে৷ কার মনে কখন কী থাকে, তা কি আর বলা যায়? প্রয়োজন পড়লে কাছে শপিং মল বা পুলিশ স্টেশনে সরাসরি চলে যেতে বলুন৷

এত কিছুর পরেও যদি বিপাকে পড়তে হতে পারে৷ এর জন্য অস্ত্র মজুত রাখুন৷ মেয়েকে শেখান, কীভাবে সামনের জনকে জব্দ করা যায়৷ ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে৷ এর জন্য সবেচেয়ে বেশি দরকার যে কোনও পরিস্থিতিতে মাথা গরম না করা৷ মাথা যত ঠান্ডা থাকে, খেলে বেশি৷ বুদ্ধি আসে তৎক্ষণাৎ৷ ফলে মাথা গরম একেবারেই নয়৷ আক্রমণকারীর চোখ, পেট ও পেনিসের দিকে নজর রাখতে বলুন৷ এগুলিতে আঘাত করলে সবথেকে বেশি কাজ হয়৷ অবস্থা বুঝে হাত বা হাঁটুর প্রয়োগ করুন৷

এতকিছু যদি নাও আসে, তবে চুপিচুপি আরও একটা অস্ত্র বলে রাখি৷ বডি স্প্রে৷ চোখে গুছিয়ে বডি স্প্রে বা পারফিউম চালিয়ে দিতে শেখান মেয়েকে৷ কিছুক্ষণের জন্য নিশ্চিন্ত৷ ও যতক্ষণে চোখ পরিষ্কার কচলাবে, ততক্ষণে আপনার কন্যাটি পগার পার৷