আমার মেয়ে তো শর্টস্কাট পড়েনি

322

আসিফা বানো আমাদের সমাজের বিবেকের ওপর তীব্র কষাঘাত। ঘটনা পুরনো! কিন্তু বিগত কয়েকদিন ধরে তাঁকে নিয়ে অনেক হইচই চলছে, চলছে অনেক লেখালেখি। ফুটফুটে শৈশবে তীব্র যন্ত্রণা সয়ে চলে যেতে হয়েছে তাঁকে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘জাস্টিস ফর আসিফা’ হ্যাশট্যাগ। নেটিজেনদের ব্ল্যাক প্রোফাইল পিকচারে আসিফা ক্ষত হয়ে উঠেছে দগদগে। কিন্তু হঠাই আসিফার হাওয়া কেড়ে নিল নববর্ষের সাজ, বৈশাখী বিয়ে বাড়ির ধুম, পঞ্চায়েত ভোট। এবার চাপা পড়ে যাবে তাঁর কথা। কিন্তু এ সমাজের ফাঁপা মূল্যবোধের খোলস ছিঁড়ে দিয়ে আসিফা একদিন ঠিক ফিরবে। তাঁর ফেলে যাওয়া শৈশবের আঙিনার আবার খেলবে রান্নাবাটি। ফিরবে আমার মেয়ে। অসহায় এক মায়ের কথনে কান পাতলেন মানসী সাহা

সোনা ঘুমাল পাড়া জুড়াল
বর্গি এল দেশে
বুলবুলিতে ধান খেয়েছে
খাজনা দেব কিসে?

না কাজের সময় আর জ্বালাবে না মেয়েটা। রোজকার ওর দুষ্টুমিতে নাজেহাল হয়ে উঠেছিলাম। দুই বোন মিলে সারাটা দিন কী দস্যিপনাই না করত! দুপুরবেলা মোটে ঘুমাতে চাইতো না। কতো জোরজার করে, গান শুনিয়ে, গল্প বলে-তবে মেয়ের চোখে ঘুম আসত। কিন্তু ওই মেরে কেটে দেড় ঘণ্টা! তার বেশি কোনওদিন ঘুমাইনি মেয়েটা আমার। কিন্তু সেদিনের পর থেকে ওর ঘুম ভাঙছেই না! যে মেয়ে আমার এক ডাকে ছুটে চলে আসত, সেদিন কতো করে ডাকলাম। উঠল না! নরম তুলতুলে মেয়ের শরীরটা আমার শক্ত কাঠ হয়ে গিয়েছে। ওর বড় বড় টানা চোখ দু’টি কেমন কেমন ছোট্ট লাগছিল। জানো আমার মেয়েটার দু’চোখ ভরে স্বপ্ন দেখত, পড়াশোনা করে খুব বড় হবে। আমাদের নিয়ে শহরে যাবে। কিন্তু ওর স্বপ্ন গুলি পূরণ হল না! কেন আমার মেয়ের ছোট ছোট স্বপ্ন গুলি ভেঙে দেওয়া হল হিংস্রভাবে? সে কী জীবন থেকে বেশি কিছু চেয়েছিল? জানি না! মেয়ের স্কুল ইউনির্ফম, ওর খেলনা গুলি বুকে জড়িয়ে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফিরছি। কিন্তু আমার সেই প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। শরীরের দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রণা বোধটা হারিয়ে ফেলেছি। আজ আমার সামনে ভিড় করে প্রশ্নরা, যার উত্তর আজও তোমাদের সমাজ দেয়নি।

এই তো সেই দিনের কথা। আমার কোল আলো করে এসেছিল আসিফা। ওর বাবার খুব সাধ ছিল মেয়ের। তাই খুব খুশি হয়েছিলাম আমরা। তবে সেই সঙ্গে সঙ্গে বুকটাও কেঁপে উঠেছিল। ভয়ে! আজকাল চারিদিকে এতো ধর্ষণের ঘটনা। আমরা পাড়ব তো, আমাদের মেয়েকে এসব থেকে রক্ষা করতে! সেদিন ওর ছোট্ট হাত দুটি ধরে বলেছিলাম, আমি সব বিপদ থেকে তোকে রক্ষা করব। কিন্তু আমি আমি পারলাম না! কিন্তু আমার মেয়ে তো শর্টস্কাট পরে ছিল না। না না ও জিন্সও পরেনি। বেগনী রাঙা চুরিদাড় পরা ছিল ওর গায়ে। শরীরেও আসেনি পরিণতি। তবে কেবল কী শুধু নারী শরীর? আর ধর্ষণের ‘সভ্যতা’য় নারী শরীর, ছিঁড়েকুড়ে খাওয়াই তো রেওয়াজ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

আমাদের ঘরে কমপিউটার নেই। চালাতেও জানি না। ফেসবুক-ট্যুইটার কী, ওসবও বুঝি না। তবে শুনছি ওখানে নাকি সবাই আমার মেয়ের হয়ে সবাই বিচার চাইছে। মনটা আনন্দে ভরে উঠছে। মনে হচ্ছে, আর বেশিদিন নেই। আমার মেয়ের অত্যাচারীরা শাস্তি পাবে। অনেক অনেক ধন্যবাদ তোমদের। পাশে পাওয়ার জন্য। মাঝ পথে কিন্তু সরে যেও না। হাওয়াবদলে বদলে যেও না। আমি চাইনা আর কোনও আসিফার জন্য তাঁর মা এমন করে কাঁদুক। তবে একটা অনুরোধ করব তোমাদের কাছে, পর্নসাইটে খুঁজো না আমার মেয়েটাকে। গ্রামের লোক বলাবলি করছে, পর্ন সাইটে আমার মেয়েটাকে খোঁজ করছে কারা! একরত্তি মেয়ের যন্ত্রণাতেও এই সমাজ জমিয়ে তুলতে চাইছে বিনোদনের মৌতাত। এক মায়ের ধিক্কার এই সভ্য সমাজকে।

রাজনীতির আমি কিছু সত্যি বুঝি না। রান্নাঘর আর দুই মেয়ে নিয়েই ছিল আমার পৃথিবী। কিন্তু এখন অনেক কিছু জানতে পারছি। শুনছি আমার মেয়ের যন্ত্রণা নিয়ে রাজনীতি হচ্ছে। ভেদ করা হচ্ছে ধর্মে। কে যেন একজন বলেছেন, “ভালো হয়েছে, আসিফার আট বছরের মধ্যেই মৃত্যু হয়েছে। তা না হলে ও বড় হয়ে ভারতবর্ষের বুকে বোমা ছুড়ত।” হ্যায় ইশ্বর তুলি মেয়ে আর পাঠিও না এই পৃথিবীতে। যদিও পাঠাও হবে প্রতিটি কন্যার জন্ম হোক নাস্তিক হয়ে। কারণ উপজাতি সংঘর্ষ কী জিনিস, আমার ছোট্ট মেয়েটা জানত না। জল-জঙ্গল-জমির দখল নিতে মানুষ যে কী করতে পারে তাও তার কল্পনার বাইরে। সে শুধু তার ঘোড়াটি আনতে বাইরে বেরিয়েছিল। আর ঘরে ফেরেনি।

আমি চাই না আর কোনও আসিফা এমন করে দুঃখ পাক। তাই লক্ষ্মী-স্বরসতী অনেক হয়েছে। এবার মা চণ্ডীর রূপ দেখুক সমাজ। অসহায়ের মতো আর মরতে নয় প্রয়োজনে ‘গুলাব গ্যাং’ এর মতো তৈরি হবে ‘আসিফা গ্যাং’। মৌন হয়ে নয় সরব কন্ঠে পৌঁছে দেব আমার, আমাদের বেঁচে থাকার দাবী।