বিয়ে vs লিভ ইন

772

মেয়েরা যতই পড়াশোনা করে নিক না কেন, গ্র্যাজুয়েশন। পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন। কিন্তু যতক্ষণ না সিঁথিতে সিঁদুর উঠছে তাঁদের জীবন অসম্পূর্ণ। সেই আদি সময় থেকে মেয়েদের এই পুঁথি পড়াছে সমাজ। তবে সময়ের সঙ্গে পাল্টেছে মেয়েদের ভাবনা। এসেছে সম্পর্কের নতুন নাম ‘লিভ ইন’। যাকে আড়চোখে দেখছে সমাজ! আধুনিকার জোয়ারে পাল তুলেছে ‘লিভ ইন’ পতাকা। কিন্তু ‘আহম আজকের আধুনিকা’ এই ভাবনায় না বয়ে মন থেকে কী ভাবছে আজকের নারী! বিয়ে নাকি লিভ-ইন! কোন দিকে ঝুঁকছে আজকের অনন্যারা! কলম ধরলেন মানসী সাহা

চমকানো কিছু প্রসঙ্গে পর্দা তুলছি এপর্বে। না চমকানোর কথা শুধু কেন বলি? আপনাদের সঙ্গে তো আর ছেলেখেলা করা যায় না! তবে লোফালুফি করলে কিছু করার নেই বাবা। আসলে বিয়ে আর লিভ-ইন-এর পার্থক্যটা কোথায়? আমি তো দেখি না! মোদ্দাকথা একে-অপরের স্বাধীনতা সযত্নে র‍্যাকে তুলে ‘অডজ্যাস্ট’ করে যাও। আর কি? যদিও একথা একদম সর্বজন স্বীকৃত । নয় বলছেন? আমি ভুলভাল লিখছি মনে হচ্ছে? কিন্তু আপনারা আছেন সঠিক অবস্থানে ….আপনাদের এটাই ধারণা তাইতো? তবে আশা করি দু’একজন আমার সুরে কথা বলবে। ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ গোছেরও পাবলিক বৃষ্টির মরশুমে মুড়ি তেলেভাজার সঙ্গে জুড়ে দেবে তুমুল আলোচনা। আর বাকিরা নিজের ধারনায় থেকে যাবে বিলকুল ঠিকঠাক। তাহলে আসুন তিনে মিলে কাগজ পেন নিয়ে বসি। আগে লিখে নিই গুটি কয়েক প্রশ্ন। উত্তর-প্রত্যুত্তরে বাড়ুক না হয় কিছু কথা…….।

আচ্ছা ভারতের অধিকাংশ মানুষের বিবাহিত জীবন কেমন? বিয়ের পর কি তারা খুশি? বিয়ের পর কতজনের মনে হয় পা-য়ে তাদের শিকল বেঁধে দেওয়া হয়েছে? কিংবা কতজন মনে করেন ছন্নছাড়া জীবন বিয়ের পর সাজানো বাগান? কার কার কাছে বিয়ে বন্ধুপ্রাপ্তি, যে সুখে-দুঃখে সারাটা জীবন থেকে যাবে পাশে? অন্যদিকে কতজন মানুষ বাঁধনছাড়া ভালবাসা উপভোগ করতে চান? বাঁধনছাড়া ভালবাসা মানে কিন্তু আজ রাম, কাল শ্যাম, একপা পুরী অন্য-পা পহেলগাঁও, চোখে চোখ রেখে রূপকথার প্রেম নয়। শুধু দায়িত্ববোধ কম, তবে সাথীটির নয় পারিবারিক দায়িত্ব। আর না হয়, বিয়ে বা লিভ-ইন এসব থেকে দূরে নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত! শারীরিক চাহিদা মেটাতে ওয়ান নাইট স্টে আর মনের খোরাক ‘পত্রমিতালি’। ‘তিন’ মত মিলে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে, একটু রিসার্চ করে নিন। দয়া করে নিজের মত দেবেন না। আশে-পাশে আপনার মানুষগুলির কাছে একটু জানতে চাইলেই মিলবে মনের খোঁজ।

1

প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজা হয়ে গেলে আসুন অন্য কথায়। আচ্ছা বলুন তো মানুষ কেন বিয়ে করে? আমরা সমাজবদ্ধ জীব। সমাজের তৈরি নিয়মের বাইরে যেতে পারব না। তাই বিয়ে! তাই বুঝি? না! তাছাড়া অসময়ে কারও শক্ত হাত, চোখের জল ফেলতে কারও কাঁধ, মনের কথা বলায় মানুষ, প্রিয় বন্ধু, খুনসুটি, আদর, বংশবৃদ্ধি-এসবের জন্যই বিয়েটা জরুরি। আচ্ছা, বিয়ে ছাড়া বুঝি এগুলি দুষ্প্রাপ্য? এই প্রশ্নে ‘মানুষ’ মানে আপনাদের উত্তর দেওয়ার আগে, আমি বলি কি, আপনাদের কখনও মনে হয়েছে জীবনের রাশকে টেনে ধরতে বিয়ে। মানে একা তো বেশ ছিলাম, হঠাৎ করে কেন বেড়ি। দুজনকে তো আস্টেপিষ্টে তো বাঁধলই সঙ্গে লেজ বাবা-মা, মামা-পিসি সম্মানীয় পরিবারবর্গ। আচ্ছা আপনাদের উল্লেখিত বিয়ের সব প্রাপ্তি যখন লিভিং-এ মিলছে, তবে কেন লোক খাইয়ে খাবারে নুন কম হয়েছে শুনে মহা তোরজোড় করে বিয়ে?

2

আচ্ছা আপনি বলুন না, লিভ-ইন-এ কি ভালবাসা থাকে না? না থাকলে কেন দুটি মানুষ একসঙ্গে থাকবে? আর ভালবাসা থাকলেই একে-অপরের সুখ-দুঃখের ভাগীদার হবেই। নাকি লিভ-ইন করলে বংশবৃদ্ধি হয় না? আপনার কি মনে হয় না, বিয়ে আর লিভ-ইন-এর মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই? দুটোরই মূলকথা অ্যাডজাস্টমেন্ট অ্যাডজাস্টমেন্ট অ্যান্ড অ্যাডজাস্টমেন্ট । সেই যদি কম্প্রোমাইজ করতে হয়, তাহলে কেন হাতের মুঠোয় পাওয়া সুবিধে নেব না। আফটার অল মানুষ সবার আগে নিজের সুবিধেই দেখে। তাই যখন মহামান্য আদালত লিভ-ইন-এ স্বীকৃতি দিয়েছে। আপত্তি কোথায়?

3

হুম! কতগুলোর উত্তর ব্যাখ্যা সহকারে বেশ ভালোমতোই বুঝিয়ে দিলেন? কিন্তু কিছু উত্তরে জট খুলল না। যদি আপনার এই হাল হয়, তাহলে একবার ওদের কথা ভেবে দেখুন? ‘বিয়ে’ মানে কি সেটা বুঝে ওঠার আগেই যাঁদের বেঁধে দেওয়া হয় সম্পর্কে। আপনি যথেষ্ট শিক্ষিত, ইন্টারনেটে সড়গড়, আরামসে ব্লগ পড়ছেন, আপনার উত্তর দিতে যদি থতমত খেতে হয়, ওঁদের তো কিছু বলারই থাকবে না। সম্পর্ক কি জিনিস বুঝে ওঠার আগেই কাঁধে-কোলে দুটি নিয়ে সংসারের ঘানি টানছে তারা। চুন থেকে পান খসলে কারও শরীর পুড়ছে আগুনে তো কারও দেহ টানিয়ে দেওয়া হয় সিলিং ফ্যানে। ওঁদের যদি আপনার নিজস্ব অবস্থান থেকে, এইসব প্রশ্ন করেন, আর ওরা যদি উত্তরে, “ বিয়ে মানেই বাচ্চা জন্ম দিয়ে, স্বামীর বংশ রক্ষা”, বলেন তাহলে তা নিয়ে খিল্লি করবেন?

আশা করি মেনে নেওয়া গেল, বিয়ে আর লিভ-ইন যাই নাম দেওয়া হোক আসল কথা মানুষের অস্তিত্ব ধরণীতে টিকিয়ে রাখা। এবার আপনাকে জিজ্ঞাসা করি সামাজিক ভাবে বিয়ে করলে তার স্থায়িত্ব দীর্ঘকাল, আর লিভ-ইন-এ ক্ষণিকের মোহ, চাহিদা মিটে গেলে খুলে যাবে সম্পর্কের বাঁধন- এটা কেমন কথা? ওই বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে এটা সারাণত, না বিশেষ? ওদের সার্বিক বোধ ও মানসিক পরিপূর্ণতা কী বলে?

4

ভূমিকা জায়গা খেয়ে নিল অনেক। ইনিয়ে বিনিয়ে যা বলতে চাইছেন তা হল, সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক ভয় এসবের কারণে বিয়েটা ভাঙা সহজ নয়। আরে দুটি মানুষের একটা সময় পর একে-অপরকে নাই ভাল লাগতে পারে! কিন্তু লোকনিন্দার ভয়ে পঁচে-গলে যাওয়া সম্পর্কটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। যদিও বলে রাখি এমনটা কিন্তু আর হচ্ছে না। আদালতের দিকে চোখ রাখলে বুঝবেন থাকে থাকে রাখা ডিবোর্স ফাইল। তাহলে কোথায় গ্যারান্টি বিয়ে টিকবেই! আজকাল সবই ক্ষণিকের। যতই আমার আমার বল কিছুই যে আমার নহে। তাই লিভিং বা বিয়ে দুটি সোনার জলে গিলটি করা। যতদিন চকচক করবে ততদিন। এর মানে এই নয় যে, সম্পর্ক নশ্বর। সব থেকে বড় কথা মনের মিল, আত্মার মিল, বন্ধুত্ব, বিশ্বাস এই চারে মিলে দু’জনকে বেঁধে রাখে বিনা সুতোর মালায়। সম্পর্ক তখনই হয় মধুর। স্বর্গীয়। যার প্রয়োজন হয় না কোনও তকমার।

তবে এতো গেল বড় বড় সব বুলি। আমার আপনার বিজ্ঞ বিজ্ঞ কথা। কিন্তু কী ভাবছে আজকের মেয়েরা। প্রথমে জানিয়ে রাখি, যেটা বলতে যাচ্ছি, তা আমার মস্তিষ্কপ্রসূত নয়। কিছু বিবাহিত-অবিবাহিত মেয়েদের কথা। যাদের কিছু সংখ্যক ভোট দিচ্ছেন ‘বিয়ে’-কে। তাঁদের কথায়, জীবনের একটা সময় পেরিয়ে গিpic-1য়ে একজনের দরকার হয়। তাই যৌবনের উদ্দামে বিয়ে না করলে পরে কিন্তু আঙুল কামড়াতে হবে। তাছাড়া লিভ-ইন কিংবা বিয়ে সেই যখন অন্যের দায়িত্ব নিতে হবে, তাহলে বিয়ে নয় কেন? অ্যাটলিস্ট বিপদে-আপদে পরিবারকে পাশে যাওয়া যাবে। তাছাড়া আমাদের বাবা-মা-রা এখনও অতটা আপটুডেট হতে পারেনি যে লিভ-ইন সহজে মেনে নেবে। তাই উভরদিক ধরে রেখে বিয়েটা করারই ভাল। কারণ দিল্লি লাড্ডু যখন খেলেও পস্তাব না খেলেও পস্তাব, তখন খেয়ে পস্তানোটাই বেটার নয় কি?

5

জেন ওয়ারা কিন্তু ভোট দিচ্ছে লিভ-ইন রিলেশনশিপে। তাঁদের বক্তব্য, অত দায়িত্ব নিতে পারব না। তাছাড়া আজ যার সঙ্গে থাকতে ভাল লাগছে, কাল ভাল নাও লাগতে পারে। বিয়ে করে ছাড়তে গেলে কোর্ট কাচারির বড্ড হ্যাপা। লিভ-ইন জিন্দাবাদ। বেশি কমিটমেন্ট নেই যতদিন ভাল লাগল থাকলাম। ভাল না লাগলে টা-টা বাই বাই।

বেশ কয়েকজন কিন্তু বিয়ে বা লিভ-ইন এর ধার দিয়েও যাচ্ছেন না। তাঁদের কাছে বোথ আর বোগাস। টাইম ওয়েস্ট ছাড়া আর কিছু নয়। সোজা কথা, সেই যখন লিভ-ইন করব বিয়ে নয় কেন? জলে যখন নামতেই হবে পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা কেন? তার থেকে কোনওটাতেই না যাওয়া ভাল। যারা লিভ-ইন এ দায়িত্ব-কমিটমেন্ট নেই বলে চ্যাঁচাচ্ছে তাঁদের কাছে শুনুন তো, ইভ–ইন-এ তাহলে আছেটা কী? অনলি সেক্স! তাই যদিও হয় বাপু লিভ-ইন এর কী দরকার আজকাল সব মেলে।

জমে উঠেছে লড়াই। আমি এখন ময়দান থেকে পালাই। ছেলে বড় না মেয়ে আদিম রিপুর লড়াইয়ের মতো লিভ-ইন নাকি বিয়ে কোনটা বেটার? এ-তর্ক থামিবার নয়। বিশেষ করে সঙ্গে যখন রয়েছে পেঁয়াজি, মুড়ি, কাঁচালঙ্কা। তাহলে আপনারা চালিয়ে যান। পরের সংখ্যায় আবার আসছি নতুন চমকের সঙ্গে। ততদিন হোক বিয়ে vs লিভ-ইন।