আমাদের নারী দিবস

231

চৈতালী চট্টোপাধ্যায়

আমরা দুজন। আমি আর মণিকা। মিষ্টি একটা মেয়ে, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত আমার সঙ্গে থাকে। এবার দেখা যায়, আমাদের দু’নারীর এই আট মার্চ, মানে, আন্তর্জাতিক নারী দিবস কাটে কেমন ভাবে!

আমার নারী দিবস:

চৈতালী চট্টোপাধ্যায়
চৈতালী চট্টোপাধ্যায়

ঘুম ভাঙল। শুয়ে শুয়েই ফেসবুকে চোখ বোলালাম, কে কত আগুন-ঝরা পোস্ট দিয়েছে নারী নিগ্রহের বিরুদ্ধে। চা খাব? না থাক। মণিকা এসে বানিয়ে দেবে’খন। চোখ বুজে সারাদিনের স্কেডিউল ভেবে নিচ্ছি। একটা খবরের কাগজে অ্যাসাইনমেন্ট ছিল আজকের দিনটিকে নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন লেখা জন্য। লিখেছিলাম। ছাপাও হয়েছে। দেখি তো, ঠিকঠাক ছাপা হল কিনা। প্রুফ রিডিঙে ভুল থাকল না তো! এক্তু বেলা গড়ালে সেমিনারে যেতে হবে। মেয়েদের দুঃখ দুর্দশায় যত আলো ফেলা যাবে, তত সচেতন হবে সবাই।

আজ, বক্তৃতা, আলোচনা সব সেরে রাতে ফিরব। ক্লান্ত। কিন্তু! কিন্তু একটা কবিতা লেখা ইচ্ছে চেপেচুপে রেখেছিলাম কাল থেকে। মনে মধ্যে সাজানোই আছে। লিখে ফেল্ব এবার। ওখানে পড়ব–

আর আমি একাকী যাব না
বান্ধবীর লম্বা বিনুনির রেশ চিরুনিপ্রান্তে লেগে আছে।
আমাদের আঁশ-নিরামিশ কথা
মাদুরকাঠিতে বোনা হতে হতে
ফোঁপানি ও খিলখিল,
ছোবল, চুম্বন
রাগমোচনের নীল নকশা তুলেছে।
যে-মেয়ে বাল্ব নিভলে ফিউজ পালতাতে পারে
(‘ওমা! কী অলক্ষ্মী গো…’ পিসিমা বলেন,
‘আজও শাঁখে ফুঁ দিতে শিখল না!),
যে মেয়ে রন্ধন ভুলে শিল্পরং গুলেছে খাতায়
রাত্রির চেয়ে সে কালো, লেনে বাইলেনে মিশল
(বর বলে, ‘অকথ্য শরীরী!’),
এইসব মেয়েরা আজ প্লেনশাড়ি, চাঁদমুখ, মিছিলে সঙ্গে সঙ্গে যাবে।

মণিকার নারী দিবস:

ঠিক সাড়ে চারটেয় ঘুম ভাঙল। কাল রাতে বোধ হয় বৃষ্টি হয়েছিল। তাই এখন শীত শীত। আকাশটাও অন্ধকার। অরেক কেলেঙ্কারি, উনুন ধরানোর কাঠ ভিজে জাব হয়ে গেছে, বৃষ্টিতে। মাঠে যাই, খড়কুটো কুড়িয়ে আনি। বরকে ডাকবো? থাক গে, কাল নেশ করে অনেক রাতে শুতে এসেছিল, ডাকলে শেষে চেঁচাতে লেগে যাবে। শুনতে পেয়ে পাশের ঘরে শ্বশুর শাশুড়িও ঘুম ভেঙে উঠে ছেলের গলায় গলা মেলাবে। রান্না সেরে চান করতে যাব। আজকাল তো চান করতে যেতেও লজ্জা লাগে। বাথরুমের একটা দিক তো খোলা, তার ওপর আবার একটা দেয়ালের ইঁট খসে গেছে কয়েকটা। বরের সময় কোথায়! ঘুম থেকে উঠেই খালপাড়ে গিয়ে বিড়ি ফুঁকবে আর বন্ধুদের সঙ্গে তাস নিয়ে বসবে। আমি কাজে বেরিয়ে গেলে, তারপর বাড়ি ঢোকে।

খেয়েই আবার খালপাড়ে চলে যায়। ছেলেটাকে পর্যন্ত ইস্কুলে পৌঁছে দেয় না। হ্যাঁ, যা বলছিলাম, আমি চান করতে ঢুকলেই শ্বশুর ওই ইঁটের ফাক দিয়ে বাথরুমে উঁকিঝুঁকি মারে। একদিন তো তেড়ে গালাগাল দিয়েছি। বর বলল, ‘তোরই চরিত্তির খারাপ’। যাক গে এসব কথা। আজ একটু সকাল সকাল বেরতে হবে। মাসিমা থাকবে না। আজ যেন কি একটা দিন বলেছিল, তাই তাড়াতাড়ি ও-বাড়িতে সব সাড়তে হবে আমাকে, মাসিমার টিফিন বানাতে হবে। আজ কি কোনও পূজো নাকি?

সরস্বতী পুজো তো কদিন আগেই গেল। দেখি যদি সময় পাই বরের জন্য চটি কিনবো একটা। ছিড়ে গেছে, সেটাই ঘষটাতে ঘষটাতে চলে। মাসিমা তো শুনলেই বকবে, বলবে, ‘এক পয়সা আয় করে না, মারধোর করে, তুই নিজের বাড়ি করবি বলে টাকা জমাচ্ছিস, আর ওকে কিনা চটি কিনে দিবি!’ আমার পুরুষ মানুষ লাগে না গো। আমি সব পারি। দেখি, এখন উনুন জ্বলার কাজে লাগি।

সমাজের ভিন্ন-ভিন্ন স্বরে, একেক রকম ভাবে নারী দিবসের উদযাপন হয়। কেউ অন্যের চেতনা জাগাতে চায়। কেউ বা নিজেই সবকিছু সামলে নেয় মনের জোরটুকু সম্বল করে। কেউ জানে, আজ আজ নারী দিবস। কোনও মেয়ে সেটুকু জানে না। তবু, খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে শ্বাস নেয়ার স্বাধীনতাটুকুতে যে আনন্দ, ওরা দুজনেই অনুভব করে।