মৃত্যুদন্ডই দিন ধর্মাবতার…মেয়ের অত্যাচারীকে হত্যা করেছি

148

ঠিক এখনই কোথাও রাত হচ্ছে, কোথাও দিনের শুরু, কোথাও গোধূলি গড়াচ্ছে, কোথাও মাঝরাতের আকাশে ধ্রুবতারা। এখনই কোথাও রামধনু, কোথাও রোদ ঝলমল, কোথাও বৃষ্টি, কোথাও মেঘলা, কোথাও সন্ধে নিঝুম হয়ে এলোচুল খুলতে খুলতে ডেকে নিচ্ছে রাত্রির অভিমানী মুখ।

অনিন্দিতা গুপ্ত রায়
অনিন্দিতা গুপ্ত রায়

ঠিক এখনই একটি যুদ্ধবিরোধী মানুষ আকাশের দিকে মুখ তুলে বলে উঠছে–শান্তি। ঠিক এখনই এক যুদ্ধবিমান থেকে আগুনের গোলা ছুটে এসে পুড়িয়ে দিচ্ছে পিতার কোলে থাকা সন্তান।
ঠিক এখনই বিচ্ছেদ লেখা হচ্ছে দুটি করতলের মধ্যে। ঠিক এখনই কোথাও হাতের ওপর রাখা হাত মুঠো হয়ে আঁকড়ে ধরছে নীরবতার অনুবাদে ভালোবাসার ডাকনাম।

ঠিক এখনই শিলাবৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বিস্তীর্ণ শস্যক্ষেত্র আর গাছের ওপর থেকে নেমে আসছে ঝুলে থাকা অনাহার। ঠিক এখনই আতশবাজির আলোয় শোভাযাত্রায় অন্ধ হয়ে নেচে যাচ্ছে কবন্ধ ব্যান্ডপার্টি।

ঠিক এখনই জন্ম নিচ্ছে কয়েক লক্ষ শিশু, মারাও যাচ্ছে কয়েক লক্ষ শিশু। আর খুন হয়ে যাচ্ছে আরো অজস্র মাতৃগর্ভে বা জন্মের পরে। শেষোক্তগুলি কেবলই কন্যাজন্ম লাভের অপরাধে চিহ্নিত।

এক্ষুনি কোথাও ঝরে পড়ল অজস্র সবুজহলুদবাদামী পাতা বসন্ত হাওয়ায়। তাদের শিরা উপশিরায় অনেক চেনা-অচেনা মুখ আঁকা ছিল। ঝরে পড়ার কোনো সময় বা অজুহাত ছিল না তাদের। যৌতুক, আত্মহত্যা, বিষণ্ণতা, ধর্ষণ—যেকোন কারনই যথেষ্ট। এক্ষুনি কয়েকটা পাখি মাটি ছেড়ে আলোয় হাওয়ায় মেলে দিল ডানা—স্বপ্নের দিকে। তাদের পালকে মুক্তি স্বাধীনতা গান—এসব রঙের বর্ণালী।

এক্ষুনি একটা অভিমানী ঠোঁট স্ফুরিত হয়ে উঠলো অহংকারে —আমার অধিকার কেড়ে নেওয়ার বা দানের স্পর্ধা তোমায় আমি দিইনি তো! এক্ষুনি একটি অ্যাসিড গড়ানো আধপোড়া গালে উড়ে বসলো সোনালী প্রজাপতি—প্রেম মানে প্রত্যাঘাত নয়, কেউ তোমাকে বলেনি কখনো?

এক্ষুনি হাতের অস্ত্র নামিয়ে খোলাচুলের উন্মাদিনী হাউহাউ বলে উঠলো—আমায় মৃত্যুদন্ডই দিন ধর্মাবতার। আমার মেয়ের অত্যাচারীকে হত্যা করেছি আমিই।এক্ষুনি আহত সৈনিকের মুখে জল ঢেলে দিয়ে প্রার্থণামন্ত্র পড়লেন এক নার্স—তোমার জন্য নিরাময় এনে দিতে পারি!

এখনই নক্ষত্রলোকে ছাই হয়ে যাওয়া কল্পনার রঙ এসে ছুঁয়ে গেল বালিকার খেলনা স্পেসশিপ। এখনই একহাঁটু জলে নেমে মীন তুলে আনল হাঁটুঝুল লালনীল ফ্রক।

এক্ষুনি মধ্যরাতে পুরনো হারমোনিয়ামের ধুলো ঝেড়ে গানের খাতায় ডুবে গেল সাদাকালো চুলের খোঁপাটি। এক্ষুনি তার হাতে চায়ের কাপ এগিয়ে দিল কিশোর পুত্র।
এক্ষুনি হাতবদল হয়ে নাম বদল হয়ে জন্ম বদল হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল একটি বালিকা। এক্ষুনি তাকে খুঁজতে বেরিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল উদাস কিশোর।

তক্ষুনি এসব না জেনেই সবজি মাথায় স্টেশনে দৌড়ে গেল মাঝবয়িসিনী। তক্ষুনি আট’ই মার্চ, ক্যালেন্ডারে আরেকটি বেঁচে থাকা এল। কোথাও, অন্য কোথাও, ঠিক তক্ষনি–!